

জাতীয় সংসদে সম্পূরক বাজেটের আলোচনাকালে নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা হাফেজ আব্দুল মুনতাকিমের দেওয়া একটি বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক মহল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিতর্ক ও হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজের বাবা ‘শহীদ’ হয়েছেন—সংসদে করা এই দাবির সঙ্গে তার জন্মসালের এক অবাস্তব ও গাণিতিক অসঙ্গতি প্রকাশ পাওয়ায় এই সমালোচনার সূত্রপাত।
ঘটনার সূত্রপাত ও এমপির দাবি
জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন চলাকালে জামায়াতে ইসলামীকে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে আইনগতভাবে চিহ্নিত করার বিষয় এবং মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিলের ওপর আলোচনা চলছিল। এমন প্রেক্ষাপটে ক্ষোভ প্রকাশ করে নিজের পরিবারের অবদান দাবি করতে গিয়ে এমপি আব্দুল মুনতাকিম বলেন:
“আমার বাবা, আমার দাদা যুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা সাত ভাই—চারজন মুক্তিযোদ্ধা; আমার দাদারা ১৯ জনের ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠকদের একজন।”
বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি নিজেও উল্লেখ করেন যে, তার জন্ম ১৯৮১ সালে।
বিতর্ক ও গাণিতিক অসঙ্গতি
সংসদে দেওয়া এই চাঞ্চল্যকর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরপরই সচেতন মহল তার নির্বাচনী হলফনামা খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা এবং উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, আব্দুল মুনতাকিমের জন্ম ১৯৮১ সালের ১০ জানুয়ারি। সে হিসাবে বর্তমানে তার বয়স ৪৫ বছরের কিছু বেশি (৪৪ বছর ১১ মাস)।
হলফনামার এই তথ্য সামনে আসার পর নেটদুনিয়ায় তীব্র ট্রল ও সমালোচনা শুরু হয়। সাধারণ মানুষ ও বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তোলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যদি তার পিতা শহীদই হয়ে থাকেন, তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার দীর্ঘ ১০ বছর পর ১৯৮১ সালে এই সংসদ সদস্যের জন্ম কীভাবে সম্ভব? এটি কেবল অলৌকিক বা গাণিতিকভাবেই অসম্ভব নয়, বরং একটি চরম ও হাস্যকর মিথ্যাচার।
অভিযুক্ত সংসদ সদস্যের ব্যাখ্যা
বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল বিতর্ক ওঠার পর মঙ্গলবার রাতে আব্দুল মুনতাকিম একটি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, তার বাবা এখনো জীবিত আছেন। নিজের পূর্বের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন:
“আমার বাবা এখনো আছেন। আমার দাদা যুদ্ধ শহীদ। তিনি আমার বাবার চাচা। আমি বোঝাতে চেয়েছি আমার বাবা-দাদাদের মধ্যে যুদ্ধে শহীদ আছেন। আমি আক্ষরিকভাবে আমার বাবা যুদ্ধে শহীদ তা বোঝাইনি।”
বিশিষ্টজন ও লেখকদের প্রতিক্রিয়া
সংসদে একজন আইনপ্রণেতার এমন স্ববিরোধী ও বিকৃত তথ্য উপস্থাপন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্টজনেরা।
মফিদুল হক (ট্রাস্টি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর): তিনি বলেন, “মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো ধরনের মিথ্যাচার কাম্য নয়। তাঁর ওপরে একজন আইন প্রণেতার জাতীয় সংসদে এ ধরনের বিকৃত তথ্য উপস্থাপন কোনোভাবেই কাম্য নয়। এর মাধ্যমে তাঁরা আবার প্রমাণ করলেন, তাঁরা কী রাজনীতি করেন।”
আখতারুজ্জামান আজাদ (লেখক): তিনি তার এক ফেসবুক পোস্টে কিছুটা ব্যঙ্গাত্মক সুরে লিখেছেন যে, মুনতাকিমের দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হতেই পারেন, তবে সেটি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতেও হতে পারে। যারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে কাজ করে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হয়েছেন, তাদের নাতিরাও নিজ নিজ দাদাকে ‘যুদ্ধে শহীদ’ দাবি করতেই পারেন। কারণ কোনো না কোনো মাপকাঠিতে (যেমন পাকিস্তানের দৃষ্টিতে) তারা হয়তো শহীদ।
জাতীয় সংসদের মতো পবিত্র জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজের পরিবারের ইতিহাস নিয়ে এমন বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্য দেওয়ায় জামায়াত নেতা আব্দুল মুনতাকিমকে নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনো সমালোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত তার দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য করুন