
বাংলাদেশের রাজনীতির পালাবদল মানেই যেন বিচারিক কাঠামোর এক বিশাল ওলটপালট। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দেখা যাচ্ছে এক অভাবনীয় দৃশ্য। যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এক সময় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের দণ্ড দিয়ে আলোচনায় ছিল, সেই ট্রাইব্যুনালের দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত—আপিল বিভাগ থেকে একে একে খালাস পাচ্ছেন। জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোবারক হোসেনের পর এবার বাগেরহাটের খান আকরাম হোসেনের খালাস পাওয়া এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
প্রেক্ষাপট: বিচার কি প্রভাবমুক্ত?
২০১০ সালে যখন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়, তখন থেকেই এর নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াত অসংখ্য লবিস্ট নিয়োগ দেয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যখন অন্তর্বর্তী সরকার আসে এবং পরবর্তীতে বিএনপির শাসনামলে বিচারিক অঙ্গনে বড় পরিবর্তন ঘটে, তখন থেকেই মানুষের মনে প্রশ্ন ছিল—আগের সরকারের সময়ে দেওয়া রায়গুলো কি টিকে থাকবে? এ টি এম আজহারের মতো হাই-প্রোফাইল নেতার মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস এবং পরবর্তীতে আকরাম হোসেনের মুক্তি সেই প্রশ্নকেই উসকে দিচ্ছে।
কেন এই খালাস? আইনি না রাজনৈতিক?
আকরাম হোসেনের রায়ের পর চিফ প্রসিকিউটর যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ‘এ টি এম আজহারুল ইসলামের রায়ের আলোকে’ এই খালাস দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। আইনি ভাষায় এর অর্থ হলো—সাক্ষ্য-প্রমাণের অসংগতি বা প্রসিকিউশনের দুর্বলতা। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এর পেছনে ভিন্ন মাত্রা দেখছেন।
প্রসিকিউশনের পুনর্গঠন: সরকার পরিবর্তনের পর ট্রাইব্যুনাল ও আপিল বিভাগের প্রসিকিউশন টিমে পরিবর্তন এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন প্রসিকিউটরদের আগের সরকারের আমলের মামলাগুলো প্রমাণের ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ বা প্রমাণের অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সাক্ষীদের অবস্থান পরিবর্তন: গত দেড় দশকে অনেক সাক্ষী তাদের জবানবন্দি পরিবর্তন করেছেন কিংবা মরণোত্তর সাক্ষ্য নিয়ে আদালতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক আশ্রয়ের অভাবে বা ভয়ের পরিবেশ না থাকায় অনেক সাক্ষী এখন আগের জবানবন্দি থেকে সরে আসছেন।
এটিএম আজহার ও আকরাম: একটি তুলনামূলক চিত্র
এ টি এম আজহারুল ইসলাম ছিলেন জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা, যার বিরুদ্ধে রংপুর অঞ্চলে গণহত্যার অভিযোগ ছিল। অন্যদিকে আকরাম হোসেন ছিলেন বাগেরহাটের একজন স্থানীয় রাজাকার নেতা। তাদের খালাস পাওয়ার ঘটনাটি একটি চেইন রিঅ্যাকশনের মতো কাজ করছে। আজহারের রায়ে আদালত যে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ বা প্রমাণের ঘাটতির কথা বলেছেন, সেই একই যুক্তিতে স্থানীয় পর্যায়ের রাজাকারেরাও এখন মুক্তি পাচ্ছেন। এটি কি কেবলই আইনি জয়, নাকি পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফসল—তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে।
ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে। যদি সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে বা আইনি কারিগরি জটিলতায় যুদ্ধাপরাধীরা মুক্তি পায়, তবে তা শহিদ পরিবার ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আঘাত। অন্যদিকে, বিচারহীনতা যেমন কাম্য নয়, তেমনি কোনো বিচারই যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি স্পষ্ট যে, বিগত সরকারের সময় করা মামলাগুলো এখন নতুন আইনি কষ্টিপাথরের সামনে দাঁড়িয়ে। আপিল বিভাগের এই ধারাবাহিক খালাস প্রদান নির্দেশ করছে যে, প্রসিকিউশন যদি পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর রিভিউ (Review) আবেদন না করে বা শক্তিশালী যুক্তি না দেয়, তবে দণ্ডপ্রাপ্ত আরও অনেক আসামিই হয়তো অচিরেই জেলের বাইরে চলে আসবেন।
ন্যায়বিচারের মূল কথা হলো—‘একশ জন অপরাধী মুক্তি পাক, কিন্তু একজন নিরপরাধ যেন সাজা না পায়’। কিন্তু যখন অপরাধটি মুক্তিযুদ্ধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের সাথে জড়িত হয়, তখন মুক্তিপ্রাপ্তদের অপরাধের মাত্রা এবং সামাজিক সত্যতা জনমানসে গভীর ক্ষোভ বা স্বস্তির জন্ম দেয়। বিএনপি শাসনামলে আকরাম হোসেন বা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আজহারের খালাস পাওয়াকে জামায়াত সমর্থকরা দেখছেন বিচার বিভাগের ‘শুদ্ধিকরণ’ হিসেবে, আর অন্যরা দেখছেন ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অপমৃত্যু’ হিসেবে। ইতিহাসের ট্রাইব্যুনালই হয়তো শেষ পর্যন্ত বলে দেবে—এই রায়গুলো কতটুকু ন্যায়সংগত ছিল।
মন্তব্য করুন