ঢাকা সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

বুননশৈলীর মহাকাব্য—ঐতিহ্যবাহী জামদানি

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬, ০২:২৬ পিএম
দেশীয় লাইফস্টাইল ব্রান্ড মিরা’র জামদানি | ছবি: মিরা

মসলিনের উত্তরাধিকারী, আভিজাত্যের প্রতীক আর বাঙালির বুনন শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন—জামদানি। কেবল একটি পোশাক নয়, জামদানি হলো সুতোয় আঁকা এক একটি গল্প। ২০১৩ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক 'অস্পৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য' (Intangible Cultural Heritage of Humanity) হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর জামদানি আজ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এক অনন্য ব্র্যান্ড।

১. ইতিহাসের প্রেক্ষাপট: মসলিন থেকে জামদানি

ইতিহাসবিদদের মতে, জামদানি হলো অতি সূক্ষ্ম মসলিনের উন্নত সংস্করণ। মুঘল সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই শিল্প পূর্ণতা পায়। ‘জামদানি’ শব্দটি ফারসি শব্দ ‘জামা’ (কাপড়) এবং ‘দানা’ (বুটি) থেকে এসেছে। মূলত ঢাকা জেলার রূপগঞ্জ, সোনারগাঁও এবং সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার শীতলক্ষ্যা নদীর তীরের আর্দ্র আবহাওয়া এই সূক্ষ্ম সুতা তৈরির জন্য ছিল সবচাইতে উপযোগী।

২. বুননশৈলী ও মোটিফের কারুকাজ

জামদানির বিশেষত্ব হলো এর বুনন পদ্ধতি। কোনো যন্ত্র ছাড়াই সম্পূর্ণ হাতে তাঁতের সাহায্যে তৈরি হয় এই শাড়ি। এর নকশাগুলোও বেশ বৈচিত্র্যময়। উল্লেখযোগ্য কিছু নকশা হলো:

পান্না হাজার: পুরো শাড়িতে ছোট ছোট হাজারো বুটির কাজ।

করলা বুটি: করলার ছোট ছোট মোটিফ।

দুবলা জাল: জালের মতো বিস্তৃত সুক্ষ্ম কাজ।

তেরছা ও জলছাপ: কোনাকুনি বা ছায়ার মতো ফুটে ওঠা নকশা।

৩. জামদানি ও আধুনিক ফ্যাশন: একটি বিশেষ আলাপচারিতা

জামদানির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা এবং একে আধুনিক তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করে তুলতে কাজ করছে সমসাময়িক বেশ কিছু ফ্যাশন ব্র্যান্ড। তেমনই একটি পরিচিত নাম ‘মিরা’ (Mira)। জামদানির আধুনিক ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণ নিয়ে আমাদের কথা হয় ‘মিরা’র স্বত্বাধিকারী শুভ্রা কর-এর সাথে।

প্রতিবেদক: জামদানি নিয়ে কাজ করার পেছনে আপনার মূল অনুপ্রেরণা কী ছিল?

শুভ্রা কর: জামদানি আমাদের শিকড়। মসলিনের যে আভিজাত্য আমরা হারিয়েছি, তার একমাত্র জীবন্ত রূপ হলো জামদানি। তবে এক সময় দেখা যাচ্ছিল, সাধারণ মানের সুতা বা জবরজং ডিজাইনের ভিড়ে আদি জামদানি তার স্বকীয়তা হারাচ্ছিল। সেই স্বকীয়তা ফিরিয়ে আনা এবং আধুনিক জীবনযাত্রার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে একে উপস্থাপন করতেই ‘মিরা’র যাত্রা শুরু।

প্রতিবেদক: ‘মিরা’ জামদানির ব্র্যান্ডিংয়ে নতুন কী যোগ করছে?

শুভ্রা কর: আমরা চেয়েছি জামদানি যেন কেবল উৎসবের শাড়ি না হয়ে ওঠে। আমরা এর কালার প্যালেটে পরিবর্তন এনেছি। প্রথাগত রঙের বাইরে প্যাস্টেল শেড বা একটু ভিন্নধর্মী রঙের ব্যবহার করছি, যা দেশি ও বিদেশি গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে। ‘মিরা’ বিশ্বাস করে, জামদানি কেবল একটি পণ্য নয়, এটি একটি শিল্প। তাই আমরা কারিগরদের মানসম্মত পারিশ্রমিক নিশ্চিত করে তাদের হাতে বোনা নিখুঁত কাজগুলোই মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছি।

প্রতিবেদক: জামদানির ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

শুভ্রা কর: ইউনেস্কোর স্বীকৃতি আমাদের বড় শক্তি। এখন আমাদের কাজ হলো নকল বা নিম্নমানের জামদানির হাত থেকে এই শিল্পকে রক্ষা করা। জিআই (GI) ট্যাগ পাওয়ার ফলে আমাদের দায়বদ্ধতা আরও বেড়েছে। আমরা যদি সঠিক ব্র্যান্ডিং করতে পারি, তবে বিশ্ববাজারে জামদানি হবে বাংলাদেশের সবচাইতে দামী ফ্যাশন এলিমেন্ট।

৪. সংকটে কারিগর ও আমাদের করণীয়

এত গৌরব থাকা সত্ত্বেও জামদানি শিল্পের মূল কারিগররা আজও নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। কাঁচামালের চড়া মূল্য এবং নতুন প্রজন্মের কারিগরদের অনীহা এই শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং 'মিরা'র মতো বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নিরলস পরিশ্রমে পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে।

৫. জামদানি কেন আমাদের গর্ব?

সাংস্কৃতিক পরিচয়: জামদানি বাঙালির আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠ প্রতীক।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব: রপ্তানি বাণিজ্যে জামদানির রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা।

নারী ক্ষমতায়ন: এই শিল্পের সাথে জড়িত বিশাল এক জনশক্তি নারী।

শীতলক্ষ্যার তীরের সেই প্রাচীন বুনন আজও টিকে আছে এদেশের কারিগরদের আঙুলের ডগায়। জামদানি কেবল সুতোর কাজ নয়, এটি আমাদের ধমনীতে প্রবাহিত হাজার বছরের সৃজনশীলতা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় শুভ্রা করদের মতো উদ্যোক্তাদের হাত ধরে জামদানি পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের কোণায় কোণায়। আমাদের এই গৌরবকে ধরে রাখা এবং পৃষ্ঠপোষকতা করা প্রতিটি বাঙালির দায়িত্ব।

“জামদানি কেবল একটি পোশাক নয়, এটি একটি জীবন্ত শিল্পকলা।”

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পেস ত্রয়ীকে বিশ্রাম দিয়ে তরুণ দল পাঠাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া

লক্ষ্য বড় চুক্তি / বাণিজ্য যুদ্ধ ও ইরান উত্তাপের মধ্যেই বেইজিং যাচ্ছেন ট্রাম্প

দেশে হামের প্রকোপ ভয়াবহ / মৃত্যু ছাড়াল ৪০০, একদিনে ঝরল ১১ প্রাণ

১১ মে ১৯৭১: আর্তমানবতার পক্ষে কেনেডির গর্জন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

মঙ্গল শোভাযাত্রা—বিশ্বমঞ্চে বাঙালির অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান

বুননশৈলীর মহাকাব্য—ঐতিহ্যবাহী জামদানি

পদ্মা সেতু: বাংলাদেশের সক্ষমতা ও গৌরবের মহাকাব্য

অবশেষে হামে ধরা খেলেন সওদাগর!

৩৬০ প্রাণের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল মেঘনা-ফুলদী তীর

মার্কিন-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: শর্তের বেড়াজালে সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের সংকট

১০

৯ মে ১৯৭১: আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভ ও পাক-হানাদারের নির্মমতা

১১

সবাই তো এখন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান!

১২

ইউনূস সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তির আদ্যোপান্ত, পড়ুন পুরো চুক্তিটি

১৩

সবার আগে দেশ, তার আগে আমেরিকা

১৪

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট

১৫

সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা: মুখে কালো কাপড় বেঁধে সাংবাদিকদের মানববন্ধন

১৬

৩ মে ১৯৭১: অবরুদ্ধ স্বদেশ ও বিশ্ববিবেকের আর্তনাদ

১৭

হামে শিশুদের মৃত্যুর মিছিল, দায় কার?

১৮

হাম মহামারিতে বাংলাদেশে নিরীহ শিশুদের মৃত্যুর মিছিল

১৯

ঈশানগোপালপুর গণহত্যা: ফরিদপুরে ১৯৭১ সালের ২ মে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ

২০