

কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না, তবুও সবার চোখের সামনে ঘটে গেল এই মহা কেলেঙ্কারী। নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে সই হলো এই চুক্তি। এটি কোনো বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, এমনকি গোলামির চুক্তিও নয়—এটি একটি ‘প্রেসক্রিপশন’, যাতে সই করেছে দুই পক্ষ।
সাধারণত চুক্তি হয় দুই পক্ষের মধ্যে। সেখানে সমানে-সমান না হলেও কাছাকাছি কোনো অবস্থান থাকে। কিন্তু এখানে বাংলাদেশের করণীয় উল্লেখ আছে ১৪৭ বার, আর আমেরিকার মাত্র ছয় বার। একে কি আদৌ চুক্তি বলা যায়?
পার্লামেন্ট চলল, অথচ একটি ‘টু’ শব্দও হলো না। রুমিন ফারহানা বিষয়টি তুলেছিলেন, কিন্তু বলা হলো সেটি নাকি নিয়মমাফিক হয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকারি-বেসরকারি উভয় দলের সাথেই আলোচনা হয়েছে।
চুক্তির সারাংশ এখন সবার জানা। এই চুক্তির ছত্রে ছত্রে দাসত্বের ছাপ। ওদের অনুমতি ছাড়া কারো কাছ থেকে কিচ্ছু কেনা যাবে না। তাহলে রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের কী হবে? ৩৫ হাজার কোটি টাকার গম আসবে, ভুট্টা আসবে—ফলে দেশীয় কৃষি ধ্বংস হয়ে যাবে। জিএম (জেনেটিক্যালি মডিফাইড) খাদ্য ও বীজ আসবে। নিরাপদ খাদ্য উধাও হয়ে যাবে, দেশীয় বীজের বাজার শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু লাল তীর বা এসিআই-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো চুপ কেন? আব্দুল আউয়াল মিন্টুর ‘লাল তীর’ কি টিকে থাকবে?
ওষুধ কোম্পানিগুলোরই বা কী হবে? স্কয়ার, ইনসেপ্টা, অ্যারিস্টোফার্মা—সবাই চুপ কেন? দুগ্ধ ও দুগ্ধশিল্প নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কোথায় থাকবে মিল্ক ভিটা, আর কোথায় আড়ং?
নীরবে গড়ে ওঠা গবাদি পশু খামার ও মাংস উৎপাদনের যে বিপ্লব, তা হারিয়ে যাবে আমেরিকার হরমোন খাওয়ানো বিশাল গরুর মাংসের দাপটে। পোল্ট্রি শিল্প তো শেষ! সুন্দর মোড়কে বাক্সভর্তি ডিম আসবে বিদেশ থেকে।
শুধু কৃষি বা শিল্প নয়, এতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ধূলিসাৎ হয়ে গেল। এ কেমন অন্যায়, এ কেমন প্রতিশোধ! সাধারণত কোনো যুদ্ধে বিজয়ী দেশ পরাজিত দেশকে দিয়ে এ ধরনের চুক্তি সই করিয়ে নেয়। কিন্তু এখানে তো যুদ্ধ হয়নি, তবে কেন আমেরিকার এই আচরণ? কারণ, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু পাকিস্তান হারেনি, হেরেছিল আমেরিকা। হেরেছিলেন নিক্সন-কিসিঞ্জার, হেরেছিল সপ্তম নৌবহর।
সেই পরাজয়েরই প্রতিশোধ এই পদক্ষেপ। আর ‘বাটোয়ারার নির্বাচনে’ জেতা পার্লামেন্টে এজন্যই এমন শুনশান নীরবতা।
কিন্তু এই নীরবতা স্থায়ী হবে না। পার্লামেন্টে না হলে বিষয়টি আদালতে যাবে। দেশের আইনে না হলে আন্তর্জাতিক আদালত ভিয়েনায় যাবে। ইতিহাসে এমন ঘটনা তো আর নতুন নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর জাপানকে চেপে ধরেছিল আমেরিকার মিত্রশক্তি। জুরি প্যানেলের রায়কে উড়িয়ে দিয়ে রাধা বিনোদ পাল জাপানের ওপর আরোপিত শাস্তি বাতিল করেছিলেন। এই রাধা বিনোদ পাল কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণকারী একজন বাঙালি। একজন বাঙালি যদি টোকিও ট্রায়ালে জাপানকে বাঁচিয়ে আনতে পারেন, তবে বাঙালি জাতি কি এই অবমাননার জবাব দেবে না?
দেশ তো শুধু জামায়াত-বিএনপি-আওয়ামী লীগের নয়। দেশ সাধারণ দেশবাসীর—কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও জনতার। নিশ্চয়ই সবাই চুক্তিটি পড়বেন এবং এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন।
এটি আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ। সবার আগে দেশ, আমেরিকা নয়।
মন্তব্য করুন