

১৯৭১ সালের ২ মে। বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার গাভা নরেরকাঠী গ্রামে ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায় রচিত হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দেশীয় সহযোগী রাজাকাররা পূর্বপরিকল্পিতভাবে গ্রামটির নিরীহ বাঙালি হিন্দুদের উপর চালায় ভয়াবহ গণহত্যা। বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, এই হত্যাযজ্ঞে ৯৫ থেকে ১০০ জন নিরীহ বাঙালি হিন্দু প্রাণ হারান।
প্রেক্ষাপট
গাভা নরেরকাঠী মূলত স্থানীয় ঘোষ-দস্তিদার পরিবারের পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৭১ সালের আগে গাভা স্কুলবাড়ি ও গাভা বাজার এলাকা ছিল হিন্দু-প্রধান এলাকা। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী “অপারেশন সার্চলাইট” শুরু করার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চলছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২ মে এই গ্রামের ক্ষুদে ইতিহাস রচিত হয়।
যা ঘটেছিল
প্রত্যক্ষদর্শী ও ইতিহাসবিদদের বরাতে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২ মে সকালে আশেপাশের গ্রামের রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গাভা নরেরকাঠী গ্রামে প্রবেশ করে। একটি “শান্তি কমিটির সভা”র নাম করে গ্রামের হিন্দু পরিবারের সদস্যদের বাইরে আসতে বলা হয়।
একাত্তরের এক মুক্তিযোদ্ধা ও গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী বাণী লাল দাশগুপ্ত (বেনি কমান্ডার) পরে গণমাধ্যমকে বলেন, “পাকিস্তানি বাহিনী প্রায় ২০০ জন লোককে নরেরকাঠি খালের পাড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়েছিল, তাদের বলা হয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী তাদের ছবি তুলবে। তারপর তারা গুলি চালায়। অধিকাংশ লাশ খালে পড়ে যায় এবং তৎক্ষণাৎ খালের পানি রক্তে লাল হয়ে যায়” ।
প্রত্যক্ষদর্শী বেনি কমান্ডার সেই ঘটনাকে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “সেদিনের ঘটনা আমাকে প্রতিশোধ নেওয়ার সাহস জোগায়” ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজাকাররা তাদের আটক করে নিকটবর্তী খালের ধারে নিয়ে যায় এবং গুলি চালায়। গুলি থেকে বাঁচতে যারা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তারা কেউ ডুবে মারা যায়, কেউবা স্রোতে ভেসে চলে যায়। হত্যাকাণ্ডের সময় মেশিনগান ও বেয়নেট ব্যবহার করে পাকিস্তানি বাহিনী ।
পরবর্তী অবস্থা
এদিকে, স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষে গণহত্যার স্থানটি গ্রামবাসীরা চিহ্নিত করে রাখলেও আজ পর্যন্ত উন্নয়নের অভাবে তা পরিত্যক্ত রয়েছে। আজ পর্যন্ত সেই বধ্যভূমিতে কোনো স্মৃতিসৌধ স্থাপন করা হয়নি, নিহত ব্যক্তিদের নামের তালিকাও পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বানারীপাড়া ও আশপাশের বিভিন্ন বধ্যভূমি আজও অরক্ষিত রয়েছে। কোনো স্মৃতিচিহ্ন না থাকায় পরবর্তী প্রজন্ম এই ইতিহাস থেকে দিন দিন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এই ঘটনার মাত্র ৭ মাস পর ১৯৭১ সালের ২৭ নভেম্বর বেনি কমান্ডারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা বানারীপাড়া শত্রুমুক্ত করেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও গাভা নরেরকাঠী গণহত্যার শিকারদের পূর্ণ সম্মান দিতে পারেনি রাষ্ট্র।
তথ্যসূত্র
১. DBpedia – Gabha Narerkathi massacre
২. Military Wiki – Gabha Narerkathi massacre
৩. Wikiwand – Gabha Narerkathi massacre
৪. The Daily Star – “The battle of Beni Commander” (প্রকাশিত: ২৫ মার্চ ২০২১)
৫. স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত
মন্তব্য করুন