
একবিংশ শতাব্দীর রাষ্ট্রচিন্তায় এক আমূল পরিবর্তন এসেছে। প্রাচীনকালে রাষ্ট্রের ক্ষমতা নির্ধারিত হতো ভৌগোলিক সীমানা, সামরিক শক্তি এবং বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমানে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ক্রমশ সরে যাচ্ছে সিলিকন ভ্যালির কাঁচঘেরা অফিসের দিকে। এখন প্রশ্ন উঠছে—সোশ্যাল মিডিয়া কি কেবল একটি যোগাযোগ মাধ্যম, নাকি এটি অঘোষিতভাবে একটি ‘প্যারালাল সরকার’ বা সমান্তরাল শাসনব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে? এটি এমন এক শাসনব্যবস্থা যেখানে ভৌগোলিক সীমানা নেই, কিন্তু প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি।
অ্যালগরিদমই যখন সংবিধান
আইনবিদ লরেন্স লেসিগ বলেছিলেন, ‘কোড ইজ ল’ (Code is Law)। অর্থাৎ, সফটওয়্যার বা অ্যালগরিদমই এখন ডিজিটাল জগতের অলিখিত সংবিধান। ফেসবুক (মেটা), এক্স (সাবেক টুইটার) কিংবা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের ‘কমিউনিটি গাইডলাইন’ বা নীতিমালা অনেক সময় জাতীয় আইনের চেয়েও বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রপ্রধানরা যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেন, সেখানে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও জবাবদিহিতার ভয় থাকে; কিন্তু এই কর্পোরেট প্ল্যাটফর্মগুলো নিজস্ব বিচারিক কাঠামোয় কোনো ব্যক্তিকে নিষিদ্ধ (Ban) করা কিংবা কোনো বিশেষ মতাদর্শকে ‘অদৃশ্য’ (Shadowban) করে দেওয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতা রাখে। এই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে তারা কোনো রাষ্ট্রের আদালতের তোয়াক্কা করে না, যা প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে।
রাষ্ট্র বনাম প্ল্যাটফর্ম: কিছু বৈশ্বিক নজির
সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে সরকারকে প্রভাবিত করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সাথে দ্বন্দ্বে জড়াচ্ছে, তার কিছু বাস্তব উদাহরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
ব্রাজিল বনাম এক্স (X): সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিল সরকার এবং ইলন মাস্কের মালিকানাধীন ‘এক্স’-এর মধ্যকার বিরোধ ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের এক বড় উদাহরণ। ব্রাজিলীয় সুপ্রিম কোর্ট যখন ভুল তথ্য ছড়ানোর দায়ে কিছু অ্যাকাউন্ট বন্ধের নির্দেশ দেয়, তখন প্ল্যাটফর্মটি তা মানতে অস্বীকার করে। ফলে দেশটিতে এক্স-এর কার্যক্রম সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করতে হয়। এটি দেখায় যে, রাষ্ট্র তার আইন প্রয়োগ করতে চাইলে একটি টেক-জায়ান্ট কীভাবে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিল ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা: ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অ্যাকাউন্ট ফেসবুক ও টুইটার থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রপ্রধানের ডিজিটাল কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা একটি ব্যক্তিগত কোম্পানির হাতে থাকাটা প্রমাণ করে যে, তারা চাইলেই যেকোনো দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট ও ফেসবুক: মিয়ানমারে ফেসবুকের অ্যালগরিদম কীভাবে ঘৃণা বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য (Hate Speech) ছড়িয়ে গণহত্যায় ভূমিকা রেখেছিল, তা নিয়ে জাতিসংঘ পর্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। এখানে ফেসবুকের ব্যর্থতা বা তাদের ‘অ্যাকশন’ সরাসরি একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্ল্যাটফর্মটি তখন কোনো সরকার নয়, কিন্তু প্রভাবের দিক থেকে এটিই ছিল প্রধান নিয়ন্ত্রক।
ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনি লড়াই: ভারত সরকার তাদের আইটি আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রণয়ন করেছে ‘ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট’ (DSA)। দেশগুলো এখন বাধ্য হচ্ছে নতুন আইন তৈরি করতে, যাতে এই টেক-জায়ান্টগুলো তাদের দেশের আইন মেনে চলতে বাধ্য হয়। এটিই প্রমাণ করে যে, সরকারগুলো এখন বুঝতে পারছে তারা একটি ‘ডিজিটাল সাম্রাজ্যের’ মুখোমুখি।
ডিজিটাল অলিগার্কি: গণতন্ত্রের নতুন ঝুঁকি
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো যখন নিজেদের একটি ‘প্যারালাল সরকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, তখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। সরকারের কাছে জনগণ ভোট দিতে পারে, আদালতে মামলা করতে পারে। কিন্তু সিলিকন ভ্যালির কোনো সিইও যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেন, তবে সাধারণ নাগরিকের তা চ্যালেঞ্জ করার কার্যকর কোনো সুযোগ নেই। এই ‘অ্যাকাউন্টেবিলিটি গ্যাপ’ বা জবাবদিহিতার অভাবই ডিজিটাল স্বৈরাচার সৃষ্টির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলোর নিজস্ব ‘ওভারসাইট বোর্ড’ বা ‘বিচারিক কাঠামো’ থাকলেও তা কোনোভাবেই নির্বাচিত সরকারের বিকল্প হতে পারে না।
প্রভাব বিস্তারের কৌশল
এই প্ল্যাটফর্মগুলো কেবল তথ্য প্রচার করে না, বরং তারা ‘অ্যালগরিদমিক কিউরেশন’-এর মাধ্যমে নির্ধারণ করে দেয় মানুষ কী দেখবে। নির্বাচনের প্রাক্কালে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের পোস্টকে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া (Boost), আবার কোনো বিশেষ আদর্শকে দমিয়ে রাখা—এই সূক্ষ্ম কৌশলগুলো ভোটের ফলাফল পর্যন্ত বদলে দিতে সক্ষম, যার উদাহরণ আমরা ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারিতে দেখেছি।
সোশ্যাল মিডিয়া অবশ্যই তথ্য আদান-প্রদান এবং বিশ্বকে কাছাকাছি আনার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু যখনই এই প্ল্যাটফর্মগুলো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সমান্তরালে নিজের আইন ও প্রভাব বলয় তৈরি করতে শুরু করে, তখনই তা গণতন্ত্রের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রগুলোকে এখন বুঝতে হবে যে, ডিজিটাল স্বার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, এটি নাগরিক অধিকার রক্ষার লড়াই। পৃথিবী কি ক্রমশ ডিজিটাল অলিগার্কদের (Digital Oligarchs) শাসনাধীনে চলে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো লুকিয়ে আছে আগামী কয়েক দশকের প্রযুক্তিনির্ভর রাজনীতির ওপর। রাষ্ট্র যদি সময়মতো নিজস্ব আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী না করে, তবে আগামী দিনে সরকারগুলো কেবল নামেই সরকার হিসেবে টিকে থাকবে, আর আসল শাসন ক্ষমতা চলে যাবে সিলিকন ভ্যালির সার্ভার রুমে।
মন্তব্য করুন