ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

ভীমনালী গণহত্যা: যে নির্মম ট্র্যাজেডি আজও এক উপেক্ষিত

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
২২ মে ২০২৬, ০৮:৪২ এএম
২২ মে ২০২৬, ০৯:০০ এএম
ভীমনালী গণহত্যা: যে নির্মম ট্র্যাজেডি আজও এক উপেক্ষিত

১৯৭১ সালের ২২ মে। পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার এক দুর্গম জনপদ ‘ভীমনালী’ গ্রাম। সেদিন এই প্রত্যন্ত গ্রামে রচিত হয়েছিল একদিকে পাকিস্তানি হানাদারদের দোসরদের বর্বরতার এক নির্মম ইতিহাস, অন্যদিকে লাঠি-বর্শা হাতে নিরস্ত্র বাঙালির অসম ও বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের এক অনন্য উপাখ্যান। আজ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও, ইতিহাসের পাতায় ভীমনালী গণহত্যা ও তার পরবর্তী নির্মম ট্র্যাজেডি আজও এক উপেক্ষিত অধ্যায়।

পটভূমি: অবরুদ্ধ গ্রামীণ জনপদে আশঙ্কার মেঘ

ভীমনালী মূলত একটি হিন্দু-অধ্যুষিত শান্ত গ্রাম ছিল, যেখানে ১৯৭১ সালে প্রায় ৮০টি বাঙালি হিন্দু পরিবারের বসবাস ছিল। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে গ্রামটি দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন থাকায়, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা প্রায়ই এখানে এসে আশ্রয় নিতেন। ফলে আশেপাশের গ্রাম থেকেও বহু হিন্দু পরিবার জীবন বাঁচাতে ভীমনালীতে সমবেত হয়েছিল।

মে মাসের শুরু থেকেই মঠবাড়িয়া অঞ্চলে মেঘ জমতে শুরু করে। মে মাসের ১ তারিখে স্থানীয় এক জনসভায় কুখ্যাত মুসলিম লীগ নেতা ও পরবর্তীকালে রাজাকার কমান্ডার ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বার প্রকাশ্য ঘোষণা দেয়—আওয়ামী লীগ কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা এবং হিন্দুরা পাকিস্তানের শত্রু, তাদের ধ্বংস করতে হবে। এই উসকানিমূলক বক্তব্যের পরপরই তুষখালী গ্রামের হিন্দু মহল্লাগুলোতে আক্রমণ ও লুটপাট শুরু হয়। ভীমনালী গ্রামের মানুষ বুঝতে পেরেছিলেন, বড় ধরনের বিপদ আসন্ন।

২২ মে: লাঠি-বর্শার প্রতিরোধ ও নির্মম নরকযজ্ঞ

২২ মে সকাল আনুমানিক ১০টা। ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বারের নির্দেশে প্রায় ৫০০ সশস্ত্র রাজাকারের একটি বিশাল দল পুরো ভীমনালী গ্রামটি অবরুদ্ধ করে ফেলে। অতর্কিত এই আক্রমণে আতঙ্কিত না হয়ে, বারুই বাড়ির সামনে জড়ো হওয়া প্রায় ২০০ বাঙালি হিন্দু যুবক ও গ্রামবাসী অসামান্য সাহসিকতার পরিচয় দেন। নিজেদের জীবন ও মা-বোনের সম্ভ্রম রক্ষার্থে তারা কেবল লাঠি, বর্শা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে 'ওয়াপদা বাঁধে' প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

শুরু হয় এক অসম যুদ্ধ। একদিকে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল আর আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, অন্যদিকে বাঙালির বুকের পাটা আর হাতের বর্শা। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী চলা এই সম্মুখযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধে লালু খান নামের এক কুখ্যাত রাজাকার নিহত হয়। কিন্তু ভারী অস্ত্রের মুখে বেশিক্ষণ টিকে থাকা সম্ভব ছিল না। রাজাকারেরা নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করলে ঘটনাস্থলেই ১৫ থেকে ১৮ জন গ্রামবাসী লুটিয়ে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বার স্বয়ং সখনাথ খারাতি নামের এক গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যা করে। বাকিরা বাধ্য হয়ে পিছু হটলে, রাজাকারেরা শহীদদের মরদেহগুলো টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে পার্শ্ববর্তী খালে ফেলে দেয়।

হত্যাকাণ্ড শেষেই তাণ্ডব থামেনি। এরপর চলে নারকীয় লুটতরাজ। গানপাউডার ও আগুন দিয়ে পুরো গ্রামের ৮০টি হিন্দু পরিবারের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার পর: বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, দেশ স্বাধীন হলো। ভীমনালীর যেসব মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ভারতে বা অন্য অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারা আবার শূন্য ভিটায় ফিরে এলেন। স্বজন হারানোর বেদনা বুকে চেপে তারা শুরু করলেন নতুন লড়াই।

১৯৭২ সালের ১৯ এপ্রিল, এই গণহত্যার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী ও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি যজ্ঞেশ্বর বড়ুই বীরত্ব দেখিয়ে পিরোজপুর মহকুমা আদালতে একটি ঐতিহাসিক মামলা দায়ের করেন। যুদ্ধাপরাধী আবদুল জব্বার ইঞ্জিনিয়ারকে প্রধান আসামি করে মোট ২৫৯ জন রাজাকারের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়।

কিন্তু এর পরের ইতিহাস আরও অন্ধকার ও নির্মম। মামলা করার মাত্র ছয় মাসের মাথায়, এক রাতে অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা যজ্ঞেশ্বর বড়ুইকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে। মামলার অন্যতম সাক্ষী এবং ২২ মে’র প্রতিরোধ যুদ্ধের সম্মুখসারির যোদ্ধা বিনোদ বিহারী বারুইকেও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। প্রধান সাক্ষী ও বাদীর এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে আদালত এবং থানা থেকে মামলার মূল নথিপত্রই চিরতরে গায়েব করে দেওয়া হয়। ধামাচাপা পড়ে যায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথমদিকের একটি অন্যতম প্রধান যুদ্ধাপরাধের মামলা।

বর্তমান পরিস্থিতি: অবহেলা আর অযত্নে ১৫ শহীদের গণসমাধি

আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে ভীমনালী গ্রামের সেই ওয়াপদা বাঁধের পাশে ১৫ জন শহীদের গণসমাধিটি চরম অবহেলা ও অযত্নে পড়ে রয়েছে। স্থানীয় নতুন প্রজন্ম অনেকেই জানে না যে, তাদের পায়ের নিচের মাটিতে মিশে আছে মাতৃভূমি রক্ষায় বর্শা হাতে লড়ে যাওয়া বীরদের রক্ত।

ভীমনালী গণহত্যা কেবল একাত্তরের বর্বরতার দলিল নয়, এটি বাঙালির আত্মরক্ষার ও বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের এক জ্বলন্ত প্রমাণ। এই বীর শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং হারিয়ে যাওয়া সেই মামলার ইতিহাস পুনরুদ্ধার করে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আজ সময়ের দাবি।

তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা

মঠবাড়িয়ার ভীমনলীর সম্মুখযুদ্ধ: উপেক্ষিত এক মুক্তিসংগ্রাম — দেবদাশ মজুমদার (মাঠবাড়িয়া প্রতিদিন, ২০১৩)

অবহেলা-অযত্নে পড়ে আছে ১৫ শহীদের গণসমাধি — বিশেষ প্রতিবেদন (দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২০১২)

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: সপ্তম ও অষ্টম খণ্ড।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘অসৎ মানুষের হাতে এআই গেলে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে’

১

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র / বাংলাদেশে জ্বালানি নিয়ে আসা বিমানকে আকাশসীমায় ঢুকতে দেয়নি পাকিস্তান

২

শহীদ তাজুলের স্মৃতিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তরুণ প্রজন্ম

৩

ফুলেল শ্রদ্ধায় শহীদ মিনারে আখতার হুসেনকে শেষবিদায়

৪

রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে এগিয়ে পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া

৫

জামায়াত এমপি নজরুলের বাসায় উদ্ধারকৃত চিঠিতে মরিয়মের যা লেখা

৬

জামায়াত এমপি নজরুলের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও প্ররোচনার মামলা

৭

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড: কবিতা, গান ও ক্যানভাসে শরণার্থী জীবনের করুণ আখ্যান

৮

যুক্তরাষ্ট্রকে ৭ শর্ত দিল ইরান, না মানলে ‘চূড়ান্ত যুদ্ধ’

৯

নজিরবিহীন জালিয়াতি / বাংলাদেশ ব্যাংকে পদ ছাড়াই ৩৬৫ জনের নিয়োগ ও পদোন্নতি

১০

অপ্রতিম হত্যা: কিশোর গ্যাং, অপরাধ চক্র ও পুলিশের ভূমিকা

১১

আজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’

১২

‘বারবার মামলা না দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলেন’

১৩

আসিফের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক

১৪

সিঙ্গাপুরেও মিলল বাড়ি ও ব্যাংক হিসাব / সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ১০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি সম্পদ জব্দ

১৫

​​​​​​​শীতলক্ষ্যায় নিখোঁজ চারজনের মধ্যে ৩ জনের লাশ উদ্ধার

১৬

মোদী-পেজেশকিয়ান বৈঠক: মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সংলাপ ও নিরাপদ সমুদ্রপথের তাগিদ

১৭

গুলশানে আ’লীগের মিছিল, গ্রেপ্তার ৩২

১৮

সমকাল কার্যালয়ে সাবেক ব্যুরো প্রধানের লাশ উদ্ধার

১৯

রংপুরে চার খুন: নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা, গৃহশিক্ষিকা ও পুলিশ কর্মকর্তা

২০