
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু একটি ভূখণ্ডের জন্মকাহিনি নয়; তা ত্যাগ, সংগ্রাম, নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার এক অনন্য মহাকাব্য। আর এই মহাকাব্যের পাতায় পাতায় যে কজন সূর্যসন্তানের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, তাঁদের অন্যতম তোফায়েল আহমেদ। সোমবার (১ জুন) বিকেল পৌনে ৪টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই প্রবীণ রাজনীতিক। তাঁর বিদায়ের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ও বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের।
রাজনীতির মাঠে বহু ঝড়-ঝাপটা, চড়াই-উতরাই আর কারা নির্যাতন পেরিয়ে তিনি বারবার যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, তাতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত ‘ফিনিক্স পাখি’।
কোড়ালিয়া থেকে ইতিহাসের মঞ্চে
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। মৌলভী আজহার আলী ও ফাতেমা বেগমের এই সন্তান বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ ও পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি সম্পন্ন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই ছাত্রলীগের মাধ্যমে রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি। ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে তৎকালীন ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ভিপি নির্বাচিত হন তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নিজের মেধা ও জাদুকরী সাংগঠনিক দক্ষতার জোরে দ্রুতই হয়ে ওঠেন ছাত্রসমাজের নয়নমণি।
ঊনসত্তরের মহানায়ক ও ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ঘোষক
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গৌরবময় অধ্যায় ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান। ডাকসুর ভিপি এবং সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি আইয়ুব খানের সামরিক জান্তার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর আপসহীন নেতৃত্বে গণজাগরণের মুখে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব আসামিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
এর পরদিনই, অর্থাৎ ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার ঐতিহাসিক সমাবেশে তৎকালীন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সেই থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ নামটি হয়ে ওঠে বাঙালির মুক্তির মূলমন্ত্র।
একাত্তরের ‘মুজিব বাহিনী’ ও স্বাধীনতার সূর্যোদয়
১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে চমক দেখান তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পটভূমি তৈরি থেকে শুরু করে সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ধরে রাখতে তিনি ছিলেন সম্মুখসারির রূপকার।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি প্রবাসী সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখেন। শুধু রাজনৈতিক টেবিলে নয়, রণক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অগ্রসেনানী। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহিনী ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক চার প্রধানের একজন ছিলেন তিনি।
বারবার ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়ানো
১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে (প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায়) দায়িত্ব নেন তিনি। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ড তাঁর জীবনে ঘোর অন্ধকার নামিয়ে আনে। এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, সামরিক জান্তাদের রক্তচক্ষু এবং ১৯৭৫ সালের পর থেকে বিভিন্ন মেয়াদে টানা ৩৩ মাসসহ অসংখ্যবার কারাভোগ করতে হয়েছে তাঁকে।
রাজনৈতিক বৈরিতা, নির্যাতন কিংবা দীর্ঘ কারাবাস—কোনো কিছুই তোফায়েল আহমেদকে দমাতে পারেনি। প্রতিবারই তিনি কারাগারের অন্ধকূপ থেকে ছাইচাপা আগুনের মতো, ফিনিক্স পাখির ডানায় ভর করে স্বমহিমায় ফিরে এসেছেন রাজপথে, হাল ধরেছেন আওয়ামী লীগের।
সংসদীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনা
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি নিজের জেলা ভোলা (সর্বশেষ ভোলা-১ আসন) থেকে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব এবং পরবর্তীতে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে সফলভাবে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
বিদায়, রাজনীতির আলোকবর্তিকা
ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী আনোয়ারা বেগম এবং একমাত্র সন্তান ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নীকে রেখে গেছেন এই বর্ষীয়ান নেতা। দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজডসহ বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগে অবশেষে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় চিরবিদায় নিলেন তিনি।
তোফায়েল আহমেদের বিশেষত্ব হলো, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনালগ্ন, গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের প্রতিটি বাঁকের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও কারিগর। রাজনৈতিক মতভেদ যাই থাকুক না কেন, উনসত্তরের রাজপথ, একাত্তরের রণাঙ্গন আর বাঙালির গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদ নামের এই ফিনিক্স পাখি চিরকাল অম্লান ও অমর হয়ে থাকবেন।
মন্তব্য করুন