

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বছরের শেষ নাগাদ (ডিসেম্বর) স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের জোরালো আভাস দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, কেবল নিজে একাকী নন, বরং আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও কর্মীদের সাথে নিয়েই তিনি বাংলাদেশে পা রাখবেন। একই সাথে আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে স্বেচ্ছায় আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা স্থায়ী এই আলাপচারিতায় তিনি দলের ভবিষ্যৎ রাজনীতি এবং নিজের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন।
একসঙ্গে আত্মসমর্পণের ডাক এবং আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনা জানিয়েছেন যে তাঁর দলের সিংহভাগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেই বর্তমান প্রশাসন মামলা ঠুকে দিয়েছে, যার দরুন অনেকেই এখন গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে দিন কাটাচ্ছেন। দলের এই কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানিয়েছেন যেন সবাই একসঙ্গে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন। তিনি বলেন,
“আমি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছি। আমার দলের নেতাকর্মীদেরও বলেছি একদিন তোমরা সবাই ফিরে এসো। আমরা সম্মিলিতভাবে দেশের আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করব।”
স্বদেশে ফিরলে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে, এমনকি তিনি প্রাণনাশের বা গ্রেফতারের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কা থাকার পরেও তিনি এই সিদ্ধান্তে অটল। দীর্ঘদিন ধরে লিখিতভাবে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাব দিলেও এবারই প্রথম তিনি সরাসরি কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাথে ফোনে যুক্ত হয়ে দীর্ঘ বক্তব্য দিলেন।
শেখ হাসিনা পরিষ্কার করেছেন যে, ঢাকা কর্তৃপক্ষের সাথে তাঁর ফিরে আসার ব্যাপারে কোনো ধরনের গোপন রফাদফা বা আলোচনা হয়নি। তিনি মনে করেন, ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার, গণতন্ত্রের চর্চা কিংবা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকারের মতো বিষয়গুলো কোনো অন্ধকার কক্ষের সমঝোতার বিষয় হতে পারে না। অতীতেও একাধিকবার কারাবরণ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি কারারুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কোনো ধরনের ভীতি প্রকাশ করেননি। গত বছর দেশ ছাড়ার নাটকীয় পরিস্থিতির অবতারণা নিয়ে তিনি জানান, সেদিন উত্তেজিত জনতা তাঁর তৎকালীন সরকারি বাসভবনের দিকে অগ্রসর হওয়ায় জীবনের চরম ঝুঁকির মুখে পড়েই তিনি দেশত্যাগ করেছিলেন।
দীর্ঘ শাসনের ভুল ও আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস
টানা দেড় দশকেরও বেশি সময় সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকা শেখ হাসিনা স্বীকার করেছেন যে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে কিছু ভুলত্রুটি হয়ে থাকতে পারে। তবে কোনো সুনির্দিষ্ট ঘটনার দায় স্বীকার না করে তিনি পুরো বিষয়টি দেশের সাধারণ মানুষের মূল্যায়নের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, কোনো সরকারই নিখুঁত বা ভুলের ঊর্ধ্বে নয় এবং জনগণেরই অধিকার রয়েছে সেই ভুল ও সফলতার তুলনামূলক বিচার করার।
বিগত ২০২৫ সালের মে মাসে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও তার সমস্ত অঙ্গসংগঠনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। পরবর্তীতে চলতি বছরের (২০২৬) এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদনের মাধ্যমে এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার।
এমন কঠোর আইনি প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও দল পুনর্গঠনে পর্দার আড়ালে কাজ করে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। তিনি রয়টার্সকে জানান, ইতোমধ্যেই তিনি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে অন্তত ১২৫টি আসনের স্থানীয় নেতাদের সাথে অনলাইন বৈঠক সম্পন্ন করেছেন। নিজের আইনি ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আদালতের রায়ের কারণে হয়তো আমি নিজে ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। কিন্তু একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলকে কেন পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে রাখা হবে? আমাদের কাজে কোনো ভুল থাকলে সেটার চূড়ান্ত রায় দেশের জনগণই দেবে।”
“আদালতের বিচার একটি প্রহসন”: আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
নিজের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার যৌক্তিকতা নিয়ে রয়টার্সের কাছে তীব্র ক্ষোভ ও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে যে বিচার প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে তা পুরোপুরি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দেশের মানুষের সামনে এই বিচার ব্যবস্থার "প্রহসনমূলক" রূপটি উন্মোচন করতেই তিনি আদালতে হাজির হতে চান বলে উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, গত ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা এবং তাঁর আমলের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ প্রদান করেন। এছাড়া চব্বিশের আন্দোলনের সময়কার সহিংসতা ও দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে সারা দেশে অন্তত ৬৬৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৫৩টিই সরাসরি হত্যা মামলা।
বিএনপি সরকারের প্রতিক্রিয়া: “আইন অনুযায়ী বিচার হবে”
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার এবং বিচার ব্যবস্থা নিয়ে করা মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি বাংলাকে এক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ২৪-এর জুলাই বিপ্লবে শত শত শিশু-কিশোর ও সাধারণ মানুষকে হত্যার দায়ে ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় হয়েছে এবং অন্যান্য মামলাগুলোরও বিচারিক কার্যক্রম সচল রয়েছে। শেখ হাসিনা বা তাঁর দলের নেতারা দেশে ফিরবেন কি না, সেটি সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের বিষয় হলেও, জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট অপরাধের জন্য তাঁদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর।
শেখ হাসিনার “প্রহসনমূলক বিচার” সংক্রান্ত দাবির জবাবে রিজভী অতীতে আওয়ামী লীগ আমলের যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের সময়ে একজন প্রধান বিচারক রায় দেওয়ার আগে বাইরের ব্যক্তির সাথে গোপন পরামর্শ করেছিলেন, যা পরে ফাঁস হয়ে কেলেঙ্কারির জন্ম দেয়। বর্তমান সরকার বিচার বিভাগে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করছে না দাবি করে তিনি বলেন, এখন দেশের আদালত সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কাজ করছে।
কূটনৈতিক স্থবিরতা ও ট্রাভেল পাসের জটিলতা
ক্ষমতাচ্যুতির পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং গত ফেব্রুয়ারি (২০২৬) মাসের সাধারণ নির্বাচনের পর দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকার বারবার দাবি করেছে যে, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ভারত সরকারের কাছে একাধিকবার আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। শেখ হাসিনাও সাক্ষাৎকারে নিশ্চিত করেছেন যে ঢাকা থেকে নয়াদিল্লিতে ক্রমাগত চিঠি পাঠানো হচ্ছে। তবে এই স্পর্শকাতর প্রত্যর্পণ ইস্যুতে ভারত সরকারের তরফ থেকে এখন পর্যন্ত দাপ্তরিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া বা স্পষ্ট জবাব দেওয়া হয়নি। এমনকি ডিসেম্বরের ঠিক কত তারিখে বা কোন নির্দিষ্ট আদালতে শেখ হাসিনা আত্মসমর্পণ করবেন, কৌশলগত কারণে তা প্রকাশ করতে রাজি হননি তিনি।
এদিকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে আইনি ও কারিগরি জটিলতা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা মিশ্র মত দিয়েছেন। ভারতে চলে যাওয়ার পর শেখ হাসিনার কূটনৈতিক (লাল) পাসপোর্টটি বাতিল হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে তাঁর কাছে কোনো বৈধ ট্রাভেল ডকুমেন্ট নেই। ফলে বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ 'ট্রাভেল পাস' ইস্যু করা না হলে তাঁর পক্ষে কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার হওয়া বা বিমানযোগে দেশে ফেরা প্রায় অসম্ভব।
তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে, শেখ হাসিনার স্বদেশে প্রত্যাবর্তনে আইনি কোনো নিষেধাজ্ঞা বা বাধা নেই। তিনি পরিষ্কার করেন যে, নিষিদ্ধ ঘোষিত দল আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তাঁর চলাচলের স্বাধীনতা রয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর আরও যোগ করেন: “যেহেতু তিনি আইনের দৃষ্টিতে একজন পলাতক আসামি (ফিউজিটিভ), তাই দূর থেকে কোনো আইনি সুবিধা বা আপিলের সুযোগ পাওয়ার অধিকার তাঁর নেই। তাঁকে বাধ্যতামূলকভাবে দেশে ফিরে এই ট্রাইব্যুনালেই প্রথম আত্মসমর্পণ করতে হবে। আত্মসমর্পণের পর নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে কারাগারে পাঠানো হবে এবং সেখান থেকেই তাঁকে উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করতে হবে। আপিল শুনানির পরেই কেবল তাঁর পরবর্তী আইনি ভাগ্য নির্ধারিত হতে পারে।”
মন্তব্য করুন