

রাজবাড়ী সদর উপজেলার একটি গ্রামে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের (পরকীয়া) অভিযোগে এক গৃহবধূ ও এক তরুণকে রাতভর গাছের সঙ্গে বেঁধে অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে স্থানীয় মাতব্বর ও পরিবারের সদস্যরা ওই গৃহবধূর স্বামীর সঙ্গে জোরপূর্বক বিবাহবিচ্ছেদ ঘটিয়ে অভিযুক্ত তরুণের সঙ্গে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন করান।
গত শনিবার (৪ জুলাই) রাতে রাজবাড়ী সদর উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে এই মধ্যযুগীয় বর্বরতার ঘটনা ঘটে। গতকাল রোববার থেকে ঘটনার কয়েকটি ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, একটি বাড়ির উঠানে মেহগনিগাছের সঙ্গে একই রশিতে পিঠমোড়া করে এক তরুণ ও এক গৃহবধূকে অত্যন্ত শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। এ সময় সেখানে উপস্থিত বেশ কয়েকজন নারী ও পুরুষ তাঁদের ওপর চড়াও হয়ে বিভিন্ন আপত্তিকর প্রশ্ন করছেন। ভিডিওতে অবরুদ্ধ তরুণকে বারবার রশির বাঁধন খুলে দেওয়ার জন্য আকুতি জানাতে দেখা গেলেও উপস্থিত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষকে বাঁধন খুলতে বাধা দেন এবং উল্টো তরুণের পরিবারকে মুঠোফোনে কল করে ডেকে আনার জন্য চাপ দিতে থাকেন।
ঘটনার পটভূমি ও জোরপূর্বক বিয়ে
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার বাসিন্দা ওই তরুণের সঙ্গে সদর উপজেলার ওই গৃহবধূর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল বলে গুঞ্জন ছিল। গত শনিবার রাত আনুমানিক ১২টার দিকে ওই তরুণ গৃহবধূর সঙ্গে দেখা করতে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে যান। এ সময় টের পেয়ে গৃহবধূর স্বামী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা তরুণকে হাতেনাতে আটক করেন। এরপর দুজনকে টেনেহিঁচড়ে উঠানে এনে মেহগনিগাছের সঙ্গে বেঁধে রাতভর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, গভীর রাতে খবর পেয়ে প্রতিবেশীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই তরুণ ও গৃহবধূকে গাছের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পান। সকালে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে একটি সালিশি বৈঠক বসে। বৈঠকে গৃহবধূর স্বামী ওই নারীর সঙ্গে আর সংসার না করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানালে, আইনি কোনো প্রক্রিয়া ছাড়াই স্থানীয় মাতব্বররা তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের বিচ্ছেদের (তালাক) ব্যবস্থা করেন। এরপর রাতেই একজন মৌলভি ডেকে মোটা অঙ্কের মোহরানা ধার্য করে ওই তরুণ ও গৃহবধূর বিয়ে সম্পন্ন করা হয়।
পুলিশের বক্তব্য
এ বিষয়ে রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার ঘোষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘প্রিয়ভূমি’কে বলেন: “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বরাতে আমরা বিষয়টি অবগত হয়েছি। তবে এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগী কোনো পক্ষ থেকেই থানায় লিখিত বা মৌখিক কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বা কাউকে এভাবে নির্যাতনের অধিকার কারও নেই। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি, অভিযোগ বা সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, পরকীয়া বা যেকোনো অপরাধের বিচারের জন্য দেশের প্রচলিত আইন ও আদালত রয়েছে। এভাবে গাছের সঙ্গে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন ও জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়ার ঘটনা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। তাঁরা জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।
মন্তব্য করুন