

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারানো প্রান্তিক মানুষের ভাগ্য বদলের নামে এক অভিনব ‘লুটপাটের’ আয়োজন করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। বাস্তুহারা ও প্রতিবন্ধী ৩০০ মানুষের সহায়তায় যেখানে সরাসরি অনুদান দেওয়া হবে মাত্র ৮ কোটি টাকা, সেখানে সেই টাকা বিতরণের ‘পরামর্শ’ ও প্রশাসনিক বিলাসিতার পেছনে খরচ ধরা হয়েছে ৫৩ কোটি টাকারও বেশি! দরিদ্র মানুষের সহায়তার দোহাই দিয়ে প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থই সুকৌশলে আমলা, বিদেশি সংস্থা এবং পরামর্শকদের পকেটে ভরার এমন বন্দোবস্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খোদ পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা।
প্রকল্পের আদ্যোপান্ত
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নগর একীভূতকরণ সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাগতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা প্রদান (ইন্টিগ্রেট)’ শীর্ষক একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। জার্মানির আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা ‘জিআইজেড’ (GIZ)-এর অর্থায়নে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। ১ বছর ৯ মাস মেয়াদি এই প্রকল্পটির ওপর গতকাল রোববার পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছে— খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ শহরগুলোতে উদ্বাস্তু হওয়া মানুষদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা। এর মাধ্যমে ৩০০ জন ব্যক্তিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায় সরাসরি অনুদান এবং দেড় হাজার জনের জীবিকা উন্নত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটের চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মূল লক্ষ্যের চেয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের আয়েশ ও আমলাতান্ত্রিক তোষণেই বরাদ্দের সিংহভাগ উবে যাচ্ছে।
গরিবের ভাগে ১৩.২৩%, বাকিটা অন্যদের পকেটে
মোট ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকার বাজেটে মূল সুবিধাভোগীদের চেয়ে পরোক্ষ খরচই কয়েক গুণ বেশি। বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকৃত অভাবী মানুষের হাতে অনুদান হিসেবে পৌঁছাবে মাত্র ৮ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা— যা মোট বাজেটের মাত্র ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। আর এই অনুদানের অর্থ বিতরণের বিপরীতে কর্মকর্তাদের ব্যবস্থাপনা খরচ, পরামর্শক ফি, অফিস ভাড়া এবং প্রশিক্ষণের নামে খরচ হবে বাকি ৫৩ কোটি ১৮ লাখ ৭৪ হাজার টাকা!
খরচের নামে যত বিলাসিতা ও অসংগতি
৩০০ মানুষের জন্য ৪৭৩ পরামর্শক!
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, চার জেলার মাত্র ৩০০ জন দরিদ্র মানুষের (যার মধ্যে ২৭০ জন নারী ও ৩০ জন প্রতিবন্ধী) জন্য ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা হবে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ৩০০ মানুষের জন্য অনুদান বিতরণে ‘পরামর্শ’ দিতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে ৪৭৩ জন দেশি-বিদেশি পরামর্শক! আর এই পরামর্শকদের পকেটেই যাবে ২৯ কোটি ৬২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা, যা মোট প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক (৪৮.৩৩ শতাংশ)।
নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে বিদেশ ভ্রমণের আবদার
দেশজুড়ে তীব্র ডলার সংকট ও সরকারের পক্ষ থেকে কৃচ্ছ্রসাধনের অংশ হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে এই প্রকল্পে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের ‘সাধ’ মেটাতে ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর বাইরে দেশের অভ্যন্তরে ঘোরার জন্য রাখা হয়েছে আরও ১ কোটি ২৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।
অফিস ভাড়া ও উচ্চমূল্যের আইটি সামগ্রী
দরিদ্রদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির এই প্রকল্পে ‘ব্যবস্থাপনা চার্জ’ হিসেবেই রাখা হয়েছে ১০ কোটি ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রকল্প কর্মকর্তাদের আরামদায়ক দাপ্তরিক কাজের জন্য অফিস ভবন ভাড়ার নামে বরাদ্দ করা হয়েছে ৩ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এমনকি আইটি সামগ্রী ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রেও বাজারমূল্যের চেয়ে বহুগুণ উচ্চমূল্য ধরা হয়েছে।
বাছাই প্রক্রিয়ায় অস্পষ্টতা ও আইনি লঙ্ঘন
প্রকল্প প্রস্তাবনাটি কেবল খরচের খাতেই নয়, আইনি প্রক্রিয়াতেও ত্রুটিপূর্ণ। সুবিধাভোগী বাস্তুচ্যুত ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কোন পদ্ধতিতে, কার মাধ্যমে বাছাই করা হবে— তার কোনো স্বচ্ছ রূপরেখা ডিপিপিতে নেই। এছাড়া সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ-২০০৬) এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮)-এর নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করেই এর ক্রয় পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। উপরন্তু, প্রকল্পের মেয়াদের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে পার হয়ে যাওয়ায় এর বাস্তবায়ন নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কঠোর অবস্থান
ব্যয় কাঠামোর এমন অস্বাভাবিক চিত্র দেখে পিইসি সভায় তীব্র আপত্তি তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশনের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, "প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য যেখানে প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করা, সেখানে সিংহভাগ টাকাই পরামর্শক ও আমলাতান্ত্রিক খরচে চলে যাচ্ছে। আমরা এই উচ্চ পরামর্শক ব্যয় এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক খরচ খতিয়ে দেখেছি এবং যেসব খাতে বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে সেগুলো বাধ্যতামূলকভাবে কমাতে বলা হয়েছে।"
দায় নিতে নারাজ সমাজসেবা অধিদপ্তর
ব্যয়ের এমন হরিলুট ও অস্বাভাবিকতার বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা) মো. সাজ্জাদুল ইসলাম দায় চাপান দাতা সংস্থার ওপর। তিনি জানান, এই প্রকল্পের মূল চুক্তিটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে হয়েছে এবং এটি মূলত একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প। দাতা সংস্থা জিআইজেড যেভাবে শর্ত ও প্রস্তাবনা তৈরি করে পাঠিয়েছে, সেভাবেই এটি করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দাতা সংস্থার শর্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি কেবল প্রস্তাবে রাখা হয়েছে; সরকার অনুমতি দিলে ভ্রমণ হবে, অন্যথায় টাকা ফেরত যাবে।
বিশ্লেষকদের অভিমত
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের দোহাই দিয়ে নেওয়া এ ধরনের প্রকল্প মূলত প্রান্তিক মানুষের কোনো উপকারে আসে না। যদি বাজেটের ৮৭ শতাংশই পরামর্শক আর আমলাতান্ত্রিক খরচে শেষ হয়ে যায়, তবে তা কেবলই সরকারি অর্থ ও বৈদেশিক অনুদানের অপচয়। এই ব্যয় কাঠামো আমূল সংশোধন না করলে এটি দেশের অর্থনীতিতে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।
মন্তব্য করুন