ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

১৬২ পয়েন্টে ১৬০০ গডফাদার: কার ইশারায় ঢুকছে মাদক?

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬, ০৬:২১ পিএম
১৬২ পয়েন্টে ১৬০০ গডফাদার: কার ইশারায় ঢুকছে মাদক?

সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী দেশব্যাপী শুরু হওয়া বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযানের ১৭ দিন পার হলেও এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি দেশের মাদক পরিস্থিতি। বিক্রেতা ও বাহক পর্যায়ের কিছু চুনোপুঁটি গ্রেপ্তার হলেও অধরাই থেকে যাচ্ছে মূল সিন্ডিকেটের শীর্ষ পর্যায়ের গডফাদাররা। শুরুতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দু-একটি বড় চালান জব্দের পর সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিযান অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গোয়েন্দা তথ্য ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান বলছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তা এবং মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ধসে পড়ার সুযোগে দেশে মাদক কারবারিদের তৎপরতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়, যা বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে অভিযানের মধ্যেই দেশের সীমান্তবর্তী ২৯ জেলার ১৬২টি পয়েন্ট দিয়ে দেশে অবাধে ঢুকছে মাদকের নতুন ও ভয়ংকর সব চালান।

তিন স্তরের নেটওয়ার্কে ২১ হাজার কারবারি

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, দেশের সীমান্ত ও অভ্যন্তর মিলিয়ে অন্তত ১ হাজার ৬০০ শীর্ষ মাদক গডফাদার পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে। সারা দেশে এই মাদক চক্রটি মূলত তিন স্তরে সক্রিয়, যার অধীনে কাজ করছে প্রায় ২১ হাজার খুচরা ও পাইকারি কারবারি। ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী এবং খুলনা বিভাগে কারবারিদের সংখ্যা ও প্রভাব সবচেয়ে বেশি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কারবারিরা এখন নিত্যনতুন কৌশল ও এমন নিখুঁত ছদ্মবেশ ধারণ করছে যে, তাদের নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা ঝামেলা না হলে সহজে খোঁজ মেলাই দায়। এটি দেশের মাদকের বাজারকে আরও বেশি ভয়ংকর ও অন্ধকার রূপ দিচ্ছে।”

পরিসংখ্যানের ভিন্ন চিত্র: কাগজ-কলমে স্বস্তি, বাস্তবে ভয়ংকর

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে সারা দেশে ২ কোটি ২৮ লাখ ৫৭ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার হলেও ২০২৫ সালে তা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ৮১১ পিসে দাঁড়ায়। এ ছাড়া গত বছর ১৬৬ কেজি হেরোইন, সাড়ে ১৪ কেজি কোকেন, ৯৬ হাজার ৩৫৭ কেজি গাঁজা এবং ৩ লাখ ১৯ হাজার বোতল ফেনসিডিল জব্দ করা হয়।

ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে আইস, সিসা, কেটামিন, গাঁজার কুশ এবং ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটের মতো অপ্রচলিত ও ভয়ংকর মাদকের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশের ব্যয়বহুল মাদকগুলো এখন ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

চট্টগ্রাম ও বগুড়ার মাঠপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার মতে, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে এবং মাঠপর্যায়ের স্থানীয় ‘সোর্স’ বা ইনফরমাররা এলাকাছাড়া হওয়ায় ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ধসে যায়। ফলে দীর্ঘ সময় তল্লাশিহীন সড়কগুলো ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে মাদকের চোরাচালান বেড়েছে কয়েক শ গুণ। যদিও নথিপত্রে চট্টগ্রাম রেঞ্জে মাদক মামলা ২৩ শতাংশ কমার চিত্র দেখা গেছে, তবে তা মূলত পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার ফল; মাদকের প্রকৃত বিস্তার কমেনি।

কোন সীমান্ত দিয়ে কী ঢুকছে?

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের সীমান্তবর্তী এমন কোনো জেলা নেই যেখান দিয়ে মাদক প্রবেশ করছে না। পার্শ্ববর্তী ভারত ও মিয়ানমারের কারবারিরা এই বিশাল নেটওয়ার্কের মূল জোগানদাতা।

ফেনসিডিল রুট: দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ময়মনসিংহ, ঝিনাইদহ, রাজশাহী, নওগাঁ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ। বিশেষ করে কোভিন ফসফেট মিশ্রিত ফেনসিডিল ভারতের চব্বিশ পরগনা, দক্ষিণ দিনাজপুর, কোচবিহার এবং আসামের ধুবরী হয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে।

গাঁজা ও মদ রুট: আসাম ও ত্রিপুরার সীমান্ত পার হয়ে গাঁজার চালান ঢুকছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, কুড়িগ্রাম, সিলেট ও সুনামগঞ্জে। আর দিনাজপুর ও সিলেটের সীমান্ত দিয়ে আসছে বিদেশি মদ।

ইয়াবা ও আইস রুট: কক্সবাজার ও কুয়াকাটা উপকূল এখন মাদকের সবচেয়ে বড় 'সেফ জোন'। সমুদ্রপথে মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবার পাশাপাশি মহিপুর ও কুয়াকাটা উপকূলে এবার সন্ধান মিলছে ভয়ংকর মাদক ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের। এই রুটে বহনকারী হিসেবে কোমলমতি শিশু ও নারীদের ব্যবহার করছে গডফাদাররা।

জেলাভিত্তিক চিত্র: জনমনে চরম উদ্বেগ

বগুড়া ও নড়াইল: স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে প্রশাসনের শিথিলতার সুযোগে বগুড়ার হাড্ডিপট্টি ও চকসূত্রাপুর এলাকা মাদক কারবারিদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়। নড়াইলেও মাদক কেনাবেচা ও সেবনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা।

হবিগঞ্জ: সীমান্তবর্তী চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলার সীমান্ত গ্রামগুলোতে সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় মাদক সিন্ডিকেটের প্রকাশ্য তৎপরতা।

রাজবাড়ী ও পটুয়াখালী: রাজবাড়ীতে এখন হাট-বাজারে ও রাস্তার ধারে হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক, যার ফলে কিশোরদের মধ্যে চুরি ও ছিনতাইয়ের প্রবণতা বাড়ছে। অন্যদিকে কুয়াকাটায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কিছু অসাধু 'সোর্স'-এর বিরুদ্ধে নিয়মিত মাসোহারা তোলার অভিযোগ উঠেছে, যার কারণে অভিযানের আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায় কারবারিদের কাছে।

সমাধানের খোঁজে বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসন

সার্বিক বিষয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “সমন্বিত উদ্যোগ ও সত্যিকারের 'জিরো টলারেন্স' নীতি বাস্তবায়ন না করলে মাদক কখনো নিয়ন্ত্রণে আসবে না। সীমান্তে শুধু পাহারা নয়, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্তে দায়িত্বরত সংস্থার কেউ এই চক্রের সঙ্গে জড়িত কি না, তা কঠোর নজরদারিতে আনা জরুরি।”

প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হচ্ছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন। ডিএনসির পরিচালক (অপারেশন্স) মো. বশির আহমেদ বলেন, "বিশেষ অভিযান ঘোষণার পর থেকে সারা দেশে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। বহু কারবারিকে গ্রেপ্তার ও মাদক উদ্ধার করা হয়েছে।"

ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক এ কে এম শওকত ইসলাম জানান, ঢাকামুখী মাদকের ট্রানজিট পয়েন্টগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সিসা লাউঞ্জ ও বারগুলোর অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন ‘প্রিয়ভূমি’-কে বলেন, “বিশেষ অভিযানে এ পর্যন্ত বিক্রেতা ও বাহক পর্যায়ের অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গডফাদারদের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।”

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘অসৎ মানুষের হাতে এআই গেলে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে’

১

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র / বাংলাদেশে জ্বালানি নিয়ে আসা বিমানকে আকাশসীমায় ঢুকতে দেয়নি পাকিস্তান

২

শহীদ তাজুলের স্মৃতিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তরুণ প্রজন্ম

৩

ফুলেল শ্রদ্ধায় শহীদ মিনারে আখতার হুসেনকে শেষবিদায়

৪

রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে এগিয়ে পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া

৫

জামায়াত এমপি নজরুলের বাসায় উদ্ধারকৃত চিঠিতে মরিয়মের যা লেখা

৬

জামায়াত এমপি নজরুলের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও প্ররোচনার মামলা

৭

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড: কবিতা, গান ও ক্যানভাসে শরণার্থী জীবনের করুণ আখ্যান

৮

যুক্তরাষ্ট্রকে ৭ শর্ত দিল ইরান, না মানলে ‘চূড়ান্ত যুদ্ধ’

৯

নজিরবিহীন জালিয়াতি / বাংলাদেশ ব্যাংকে পদ ছাড়াই ৩৬৫ জনের নিয়োগ ও পদোন্নতি

১০

অপ্রতিম হত্যা: কিশোর গ্যাং, অপরাধ চক্র ও পুলিশের ভূমিকা

১১

আজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’

১২

‘বারবার মামলা না দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলেন’

১৩

আসিফের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক

১৪

সিঙ্গাপুরেও মিলল বাড়ি ও ব্যাংক হিসাব / সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ১০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি সম্পদ জব্দ

১৫

​​​​​​​শীতলক্ষ্যায় নিখোঁজ চারজনের মধ্যে ৩ জনের লাশ উদ্ধার

১৬

মোদী-পেজেশকিয়ান বৈঠক: মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সংলাপ ও নিরাপদ সমুদ্রপথের তাগিদ

১৭

গুলশানে আ’লীগের মিছিল, গ্রেপ্তার ৩২

১৮

সমকাল কার্যালয়ে সাবেক ব্যুরো প্রধানের লাশ উদ্ধার

১৯

রংপুরে চার খুন: নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা, গৃহশিক্ষিকা ও পুলিশ কর্মকর্তা

২০