

১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গের দিন। ঢাকার পতনের দুই দিন পর আজ প্রতিরোধ যুদ্ধ নতুন মাত্রা পায়। চট্টগ্রামের কালুরঘাট থেকে কুষ্টিয়ার জেলা স্কুল, যশোর সেনানিবাস থেকে সৈয়দপুর—সারাদেশে বাঙালি প্রতিরোধযোদ্ধারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করছে। এই দিনেই বিশ্বের প্রথমবারের মতো বিস্তারিতভাবে পাকিস্তানি বর্বরতার খবর শিরোনাম হয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে।
চট্টগ্রাম: স্বাধীন বাংলা বেতারে বোমাবর্ষণ
৩০ মার্চ সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের কালুরঘাটে অবস্থিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আবারও বিশ্বের গণতান্ত্রিক সরকার ও জনগণের প্রতি আবেদন জানানো হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে এই আবেদনে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি ও সাহায্য দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
রাতে পাকিস্তান বিমানবাহিনী এই বেতার কেন্দ্রে বোমাবর্ষণ করে। ট্রান্সমিশন অ্যান্টেনাসহ ভবনের ব্যাপক ক্ষতি হয়, তবে ভাগ্যক্রমে কেউ হতাহত হননি। বোমাবর্ষণের আগেই স্বাধীন বাংলা বেতারের কর্মীরা ও সেখানে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদ স্থানে চলে যান।
একই দিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী চট্টগ্রাম শহরকে বিভিন্ন দিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের ওপর কামান দিয়ে বোমাবর্ষণ করে। রাতে নগরীর আশপাশে ছত্রীসেনা নামায় তারা। ভোর পর্যন্ত ইপিআর সদস্যদের সমন্বয়ে গড়া মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ প্রতিরোধ করে।
বিশ্বমিডিয়ায় প্রথম প্রতিবেদন
হত্যাযজ্ঞের প্রথম বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় এই দিনেই। ২৭ মার্চ বিদেশি সাংবাদিকদের ঢাকা থেকে বের করে দেওয়া হলেও কৌশলে থেকে গিয়েছিলেন ডেইলি টেলিগ্রাফ-এর প্রতিবেদক সাইমন ড্রিং। তিনি ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাদের হত্যাযজ্ঞের প্রমাণ দেখতে পান। ব্যাংককে গিয়ে তিনি দীর্ঘ প্রতিবেদন লেখেন, যা ৩০ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘বিদ্রোহ দমনে পাকিস্তানে ট্যাংক আক্রমণ: ৭,০০০ নিহত, ঘরবাড়ি ভস্মীভূত’। সাইমন ড্রিং লিখেছিলেন, ঢাকা এখন ধ্বংস ও আতঙ্কের নগরী। ২৩ ঘণ্টা ধরে অবিরাম শেল বর্ষণ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঠান্ডা মাথায় সাত হাজারের বেশি লোককে হত্যা করেছে। সেনা অভিযানে ঢাকাসহ সব মিলিয়ে ১৫ হাজার লোক নিহত হয়েছেন। তিনি আরও জানান, সেনাবাহিনী প্রধান জনপদগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এখনো গুলি চালাচ্ছে।
এই প্রতিবেদন থেকেই বিশ্ববাসী প্রথম বিশদভাবে বাংলাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ ও বর্বরতা সম্পর্কে জানতে পারে। প্রতিবেদনটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
একই দিনে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁতীবাজার ও শাঁখারীবাজার এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। সেনাবাহিনী দেশজুড়ে বেসামরিক ব্যক্তিদের হত্যা করছে।
কুষ্টিয়ায় তুমুল যুদ্ধ
কুষ্টিয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের তিন দিক থেকে আক্রমণ করে। চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের দলের নেতৃত্বে ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী।
আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৭ মার্চ ইপিআরের ফিলিপনগর কোম্পানি কুষ্টিয়া শহরের সুনির্দিষ্ট স্থানে সমবেত হয়। দলটির নেতা ছিলেন সুবেদার মুজাফফর আহমেদ। ২৮ মার্চ দুপুরের মধ্যে সীমান্তে নিয়োজিত ইপিআরের সব কোম্পানি চুয়াডাঙ্গায় সমবেত হয়। পরিকল্পনা পাল্টে আক্রমণের সময় স্থির করা হয় ৩০ মার্চ ভোর চারটা।
৩০ মার্চ ভোর চারটায় মুক্তিবাহিনী তিন দিক থেকে কুষ্টিয়া আক্রমণ করে। হঠাৎ আক্রমণে পাকিস্তানি সেনারা হকচকিত হয়ে পড়ে। ঘণ্টাখানেক তুমুল যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধারা পুলিশ লাইনস ও ওয়্যারলেস কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে পড়ে। পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্রশস্ত্র ফেলে জিলা স্কুলের দিকে তাদের সদর দপ্তরে পালিয়ে যায়। কিছু পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। জিলা স্কুল এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকা ছাড়া গোটা শহর মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
বিকেল ৫টার দিকে মতিন পাটোয়ারীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা কুষ্টিয়া পুলিশ লাইনস দখল করেন।
তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিপর্যয় ও বিদ্রোহ
উত্তরবঙ্গের সৈয়দপুর সেনানিবাসে তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনারা এই দিন বড় বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়।
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে থাকা সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট রফিক সরকার জানতে পেরেছিলেন, ৩০ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি সামরিক কনভয় রংপুর থেকে বগুড়ার উদ্দেশে যাত্রা করবে। তিনি এক প্লাটুন সেনা নিয়ে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে বেলা তিনটায় কনভয়টিকে অ্যামবুশ করেন। দুই পক্ষে প্রচণ্ড গুলি বিনিময় হয়। রফিক সরকার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী হন। পরে তাকে রংপুর সেনানিবাসে নিয়ে গিয়ে নৃশংস অত্যাচারের পর ১ এপ্রিল হত্যা করা হয়।
সৈয়দপুর সেনানিবাসে থাকা সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট সিরাজুল ইসলামকে রংপুর সেনানিবাসে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। ৩০ মার্চ সেখানে পৌঁছানোমাত্র ১০ জন বাঙালি সৈনিকসহ তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এত বিপর্যয়ের পরেও এই দিন দিবাগত রাতে তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনারা ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের (বীর প্রতীক, স্বাধীনতার পর মেজর জেনারেল) নেতৃত্বে সৈয়দপুর সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
যশোরে প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের বিদ্রোহ
যশোর সেনানিবাসে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনারা এই দিন বিদ্রোহ করেন। ব্যাটালিয়নের অর্ধেক বাঙালি সেনা মহড়া শেষে ২৯ মার্চ গভীর রাতে সেনানিবাসে ফিরেছিল। বাকি অর্ধেক ছিল ছুটিতে। ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ছিলেন বাঙালি লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেজাউল জলিল। কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্যাপ্টেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) এবং লেফটেন্যান্ট আনোয়ার হোসেন (বীর উত্তম) ছাড়া বাকি সবাই ছিলেন পাকিস্তানি।
সেনানিবাসে ফেরার পর ৩০ মার্চ বাঙালি সেনাদের প্রায় নিরস্ত্র করা হয়। নিরস্ত্র অবস্থায় পশ্চিম পাকিস্তানের সশস্ত্র সেনারা তাদের ঘিরে রাখে। রেজাউল জলিল কোনো সিদ্ধান্ত দিতে ব্যর্থ হলে বাঙালি সেনারা হাফিজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে বিদ্রোহ করেন। তারা অস্ত্রাগার ভেঙে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে গুলিবর্ষণ করতে করতে যশোর সেনানিবাস ছেড়ে আসেন। এই সময় পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে লেফটেন্যান্ট আনোয়ারসহ বহু বাঙালি সেনা শহীদ ও আহত হন। প্রায় ২০০ জন বাঙালি সেনা বেরিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
জেলায় জেলায় প্রতিরোধ যুদ্ধ
৩০ মার্চ পাকিস্তানি জান্তা প্রতিরোধ ভাঙতে রিজার্ভ সৈন্যদের সর্বত্র পাঠাতে শুরু করে। কিন্তু প্রতিরোধের মুখে পড়ে তারা সর্বত্র।
রাজশাহীর গোপালপুর রেল ক্রসিংয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধে নামেন মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ জনতা। এই যুদ্ধে ছয়টি ট্রাক ও একটি জিপসহ বিপুল অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনী সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত হয়। চিনিকলের কর্মীরা এই প্রতিরোধযুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন।
নোয়াখালীতে মুক্তিযোদ্ধারা ৪০ জন পাকিস্তানি সেনাকে বন্দি করে এবং প্রচুর গোলাবারুদ ও অস্ত্র দখল করে। এসব যুদ্ধসরঞ্জাম পরে শুভপুর যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়।
চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ায় মেজর আবু ওসমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের মুহূর্মুহূ আক্রমণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দামুড়হুদা, আলমডাঙ্গা, ঝিনাইদহের দিকে পালাতে থাকে। এই যুদ্ধে ২৫৬ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়।
গাংনী উপজেলায় ৩০ ও ৩১ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে আনসার, মুজাহিদ ও সাধারণ জনগণের লড়াই হয়। নাটোরের লালপুরে ‘ময়নার যুদ্ধে’ সাঁওতাল ও বাঙালিরা সম্মিলিতভাবে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হন।
শরণার্থী সঙ্কট ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
জীবন বাঁচাতে এই দিন পর্যন্ত প্রায় আড়াই লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। বাঙালি নারী-শিশু-বৃদ্ধদের সীমান্ত পারের এমন মানবিক বিপর্যয় ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়ও হয়নি বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেন।
ভারতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লে মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক ডাকেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তিনি পার্লামেন্টে বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রতি তার নিজের, ভারতীয় জনগণ ও সরকারের পক্ষ থেকে একাত্মতা ও সংহতি ঘোষণা করেন।
কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা অবরুদ্ধ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার সশস্ত্র সংগ্রামের বিবরণ ছাপে। তাদের খবরের শিরোনাম ছিল ‘সীমান্তের চারদিক থেকে’। পত্রিকাটি জানায়, আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ২৯ মার্চ ওপার থেকে এপারে এসেছেন। সবার একটাই লক্ষ্য—ভারত থেকে অস্ত্র সাহায্য সংগ্রহ করা।
কুষ্টিয়ার তৎকালীন এমএলএ আশহাবুল হক টেলিফোনে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, কুষ্টিয়া মিলিটারি ব্যারাক চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে এবং পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছে।
নেতৃত্বে তাজউদ্দীন আহমদ
এই দিন প্রথমে আত্মরক্ষা, তারপর প্রস্তুতি এবং সবশেষে পাল্টা আক্রমণের পর্যায়ক্রমিক লক্ষ্য স্থির করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ ফরিদপুর, কুষ্টিয়া হয়ে সীমান্তে পৌঁছান।
ফ্রান্সে পাকিস্তানি জাহাজ থেকে পাকিস্তান নৌবাহিনীর আটজন বাঙালি নৌসেনা পক্ষত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন।
দিনের সারাংশ
৩০ মার্চ ১৯৭১ ছিল প্রতিরোধ যুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কুষ্টিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়, যশোর ও সৈয়দপুরে বাঙালি সেনাদের বিদ্রোহ, চট্টগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতারের সাহসী আহ্বান, এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাকিস্তানি বর্বরতার প্রথম বিস্তারিত প্রতিবেদন—সব মিলিয়ে এই দিনটি প্রমাণ করে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যতই নির্যাতন চালাক, বাঙালির প্রতিরোধ দমনের ক্ষমতা তাদের নেই। আজ সাধারণ মানুষ বুঝতে শুরু করে—যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর-এক, পৃ. ৭৪-৭৬।
২. বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর-আট, পৃ. ৪০, ৪৮।
৩. বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর-ছয়, পৃ. ৩৬-৩৮।
৪. দ্য টেলিগ্রাফ, ৩০ মার্চ ১৯৭১।
৫. দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, ৩০ মার্চ ১৯৭১।
৬. মেজর জেনারেল হাকিম আরশাদ কোরেশি, দ্য ইন্দো-পাক ওয়ার, আ সোলজার’স ন্যারেটিভ, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পাকিস্তান (২০০২), পৃ. ৪২-৪৫।
মন্তব্য করুন