

বাঙালি জাতির ইতিহাসের কালপঞ্জিতে ৭ মার্চ কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় এবং মুক্তি কামনার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৭০-এর নির্বাচন পর্যন্ত দীর্ঘ বঞ্চনা ও শোষণের যে পাহাড় জমেছিল, ১৯৭১ সালের এই দিনে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৮ মিনিটের সেই অমোঘ বজ্রকণ্ঠ তাকে তছনছ করে দিয়েছিল। সেই ভাষণ ছিল একাধারে রণকৌশল, রাজনৈতিক দর্শন এবং স্বাধীনতার অলিখিত ঘোষণা।
বঙ্গবন্ধুর সেই ডাক—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’—নিছক কোনো আবেগীয় উচ্চারণ ছিল না। এটি ছিল নিরস্ত্র এক জাতিকে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করার এক সুনিপুণ কৌশল। বিশ্বখ্যাত সাময়িকী নিউজউইক তাই তাকে যথাযথভাবেই ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। ২০১৭ সালে ইউনেস্কো যখন এই ভাষণকে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তখন তা কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং সারাবিশ্বের শোষিত ও মুক্তিকামী মানুষের সম্পদে পরিণত হয়।
তবে সময়ের আবর্তে রাজনৈতিক পটভূমি পরিবর্তিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো ও দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। গত বছরের ১৬ অক্টোবর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ৭ মার্চের রাষ্ট্রীয় উদযাপন ও ছুটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৫ সালেও দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়নি। পাঠ্যবই থেকে এই ভাষণের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নতুন বিতর্ক ও পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। এটি অনস্বীকার্য যে, গত দেড় দশকে ৭ মার্চের ঐতিহাসিকতাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমার্থক করে ফেলার এক ধরণের চেষ্টা চলেছে, যা জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল।
কিন্তু রাজনীতির পালাবদলে দিবসটির রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বা উদযাপনের ধরনে পরিবর্তন এলেও, ১৯৭১-এর সেই মাহেন্দ্রক্ষণে এই ভাষণের গুরুত্বকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং সাধারণ মানুষকে ঘর থেকে রণক্ষেত্রে টেনে আনার পেছনে ৭ মার্চের যে মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকা ছিল, তা ইতিহাসের এক অক্ষয় সত্য।
বর্তমান গণতান্ত্রিক আবহে ইতিহাসকে নির্মোহভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ৭ মার্চ কোনো দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পদ নয়; এটি বাঙালির দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্র দিবসটি পালন করুক বা না করুক, ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল মার্চে বাঙালির হৃদয়ে যে স্বাধীনতার বীজমন্ত্র উপ্ত হয়েছিল, তা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অম্লান থাকবে। নতুন প্রজন্মের উচিত রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক ও মহানায়ককে তাদের প্রকৃত অবদানের নিরিখে মূল্যায়ন করা। শৃঙ্খলমুক্তির সেই অবিনাশী আহ্বান যেন রাজনৈতিক সংকীর্ণতায় ম্লান না হয়—আজকের দিনে এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
মন্তব্য করুন