
১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চের স্মৃতিবিজড়িত এই মাসটি ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ৪০ লাখ শ্রমিকের জন্য এক চরম অনিশ্চয়তার বার্তা নিয়ে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ এবং লোহিত সাগর অবরুদ্ধ হওয়ার প্রভাবে দেশের রপ্তানি আয় মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের পকেটে এবং সরকারের আগামী অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনায়।
১. গার্মেন্টস কর্মীদের বেতন ও ঈদ বোনাস নিয়ে শঙ্কা
আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হওয়ার কথা। কিন্তু যুদ্ধের কারণে রপ্তানি বিল (Export Bill) আটকে যাওয়ায় মালিকপক্ষ বেতন-ভাতা পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে।
বিল আটকা: শিপিং রুট বন্ধ থাকায় জাহাজীকরণ করা পণ্যের টাকা বিদেশি ব্যাংকগুলো ছাড় করছে না। ফলে উদ্যোক্তাদের হাতে নগদ টাকার (Cash flow) চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
লে-অফ বা ছাঁটাইয়ের আতঙ্ক: অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা ইতিমধ্যে কাজ না থাকায় ‘লে-অফ’ ঘোষণার কথা ভাবছে। যদি ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী যুদ্ধ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়ায়, তবে বড় ধরনের শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস: বাজারে নিত্যপণ্যের দাম ২০-৩০% বেড়ে যাওয়ায় গার্মেন্টস কর্মীদের বর্তমান বেতন দিয়ে জীবনধারণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
২. ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে যুদ্ধের কালো ছায়া
আগামী জুনে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করার কথা। কিন্তু ৫ ও ৬ মার্চের যুদ্ধের ভয়াবহ সমীকরণ অর্থ মন্ত্রণালয়ের সব হিসাব ওলটপালট করে দিয়েছে।
রাজস্ব আদায়ে ধস: রপ্তানি কমলে এবং আমদানি সীমিত হলে ভ্যাট ও শুল্ক আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে নেমে যাবে। ফলে বাজেটের আকার ছোট করতে বাধ্য হতে পারে সরকার।
ভর্তুকির চাপ: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৪৫ ডলার হওয়ায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারকে বিশাল অঙ্কের বাড়তি ভর্তুকি দিতে হবে। এটি উন্নয়ন প্রকল্পের (ADP) টাকা কমিয়ে দিতে পারে।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশে রাখার পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
৩. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান
পোশাক খাতের আয় কমে যাওয়ায় ডলারের সংকট আরও প্রকট হবে।
রেমিট্যান্সের ধাক্কা: মধ্যপ্রাচ্যের ১৩টি দেশে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে টাকা পাঠাতে পারছেন না। বিমানবন্দরগুলো (যেমন বেন গুরিয়ন বা বৈরুত) আক্রান্ত হওয়ায় প্রবাসীদের কর্মস্থল ও জীবন ঝুঁকির মুখে। এটি রিজার্ভের ওপর দ্বিগুণ চাপ সৃষ্টি করবে।
৪. বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার যদি আসন্ন বাজেটে ‘জরুরি যুদ্ধকালীন তহবিল’ বা ‘ইমার্জেন্সি ইকোনমিক প্যাকেজ’ ঘোষণা না করে, তবে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাস উঠবে। বিশেষ করে গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকদের বেতন নিশ্চিত করতে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি।
কী হতে পারে আগামী দিনের চিত্র?
যদি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট হবে একটি ‘সংরক্ষণশীল’ বা ‘টিকে থাকার’ বাজেট। বড় বড় মেগা প্রজেক্টের বদলে সরকার হয়তো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং জ্বালানি আমদানিতেই বেশি গুরুত্ব দেবে।
৫ ও ৬ মার্চের উত্তাল দিনগুলো কেবল ১৯৭১ সালেই রক্ত ঝরায়নি, ২০২৬ সালেও এটি বাঙালির রুটি-রুজির ওপর বড় আঘাত নিয়ে এসেছে। ট্রাম্পের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ কিংবা ইরানের ‘পাল্টা হামলা’—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও জাতীয় অর্থনীতি।
মন্তব্য করুন