

ইতিহাসের কিছু দিন আছে, যেগুলো কেবল একটি তারিখ নয়—সেগুলো একটি জাতির আত্মার ভেতরে স্থায়ী হয়ে থাকে। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তেমনই এক দিন। সেদিন ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান—তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান—শুধু একটি জনসভার স্থান ছিল না; সেটি হয়ে উঠেছিল বাঙালির ইতিহাসের মোড় ঘোরানো এক মহামঞ্চ।
সেদিনের আকাশে ছিল অদ্ভুত উত্তেজনা। চারদিকে মানুষের ঢল। গ্রামের মেঠোপথ, নদীর ঘাট, শহরের অলিগলি—সব জায়গা থেকে মানুষ ছুটে এসেছিল। তারা এসেছিল একজন মানুষের কথা শুনতে—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠ। তখন তিনি আর শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেতা নন; তিনি হয়ে উঠেছেন বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা, বেদনা আর স্বপ্নের প্রতীক।
বাংলার মানুষ তখন দীর্ঘদিনের বঞ্চনা আর অপমানের ভারে ন্যুব্জ। ভাষা আন্দোলনের শহীদের রক্ত, ছয় দফার আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান—সব মিলিয়ে বাঙালি বুঝে গিয়েছিল, পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরে তাদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা সম্ভব নয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণ তাদের রায় স্পষ্টভাবে দিয়েছিল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সেই গণরায় মেনে নিতে ছিল নারাজ। এই রাজনৈতিক প্রতারণা ও অনিশ্চয়তার ভেতরেই আসে ৭ই মার্চ।
রেসকোর্স ময়দানে তখন মানুষের ঢেউ। কেউ গাছে উঠে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ ঘরের ছাদে, কেউ দূরে দাঁড়িয়ে শুধু মাইকের শব্দ শোনার অপেক্ষায়। চারদিকে একটাই প্রশ্ন—আজ বঙ্গবন্ধু কী বলবেন?
বঙ্গবন্ধু যখন মঞ্চে উঠলেন, তাঁর কণ্ঠে ছিল না কোনো তাড়াহুড়ো বা উত্তেজনা। ছিল গভীর স্থিরতা এবং এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস। তিনি ধীরে ধীরে বাঙালির দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরলেন—অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক প্রতারণা, দমননীতি এবং শোষণের কথা। তারপর এল সেই অমর উচ্চারণ— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
এই একটি বাক্য যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল। মুহূর্তের মধ্যেই লক্ষ মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো স্বাধীনতার শপথ। সেদিন বাঙালি বুঝে গেল—তাদের সামনে একটাই পথ, স্বাধীনতার পথ। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর অসাধারণ দূরদর্শিতা। তিনি জানতেন, সে সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে আন্তর্জাতিক কূটনীতির মারপ্যাঁচে পড়ার শঙ্কা ছিল। কিন্তু তিনি এমনভাবে কথা বললেন, যাতে পুরো জাতি স্বাধীনতার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যায়।
তিনি অসহযোগ আন্দোলনের নির্দেশ দিলেন—কর বন্ধ করতে, অফিস-আদালত কার্যত অচল করে দিতে, প্রশাসনকে জনগণের নিয়ন্ত্রণে আনতে। কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো পূর্ব বাংলা কার্যত তাঁর নির্দেশেই চলতে শুরু করল। পরবর্তীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ রাতে নির্মম সামরিক অভিযান শুরু করে। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। ৭ই মার্চের ভাষণ বাঙালির হৃদয়ে স্বাধীনতার যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তা আর নিভিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না।
বিশ্বের অনেক নেতা বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন—
“আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এই মানুষটিই হিমালয়।”
ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে একটি জাতির স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
অবাক করার বিষয় হলো, পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি হওয়া জিয়াউর রহমানও একসময় ৭ই মার্চের ভাষণের ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকার করেছিলেন। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ ‘দৈনিক বাংলা’য় প্রকাশিত একটি ক্রোড়পত্রে ‘একটি জাতির জন্ম’ শিরোনামের কলামে জিয়াউর রহমান লিখেছিলেন, যা পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালের ২৬ মার্চ সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় পুনরায় প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন:
“৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে একটি ‘গ্রিন সিগন্যাল’ বলে মনে হলো। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত রূপ দিলাম কিন্তু তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে জানালাম না। বাঙালি ও পাকিস্তানি সৈনিকদের মাঝেও উত্তেজনা চরমে উঠেছিল।”
জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি আজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। জিয়াউর রহমানের সন্তান তারেক রহমান এখন প্রধানমন্ত্রী। অথচ এবারের ৭ই মার্চেও বিগত অসাংবিধানিক অন্তর্বর্তী সরকারের মতোই ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি পুলিশ দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বাজানোর অপরাধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হওয়া হয়েছে, দুঃখজনকভাবে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
অমোঘ সত্য সম্ভবত তারা জানে না—অত্যাচার ও নির্যাতন করে ইতিহাস আর আদর্শ মুছে ফেলা যায় না। ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ‘নিউজউইক’ ম্যাগাজিন বঙ্গবন্ধুর বাগ্মিতা ও দূরদর্শিতার প্রশংসা করে তাঁকে ‘রাজনীতির কবি’ (Poet of Politics) হিসেবে আখ্যায়িত করে লিখেছিল, তিনি সাড়ে সাত কোটি মানুষের একচ্ছত্র নেতা। তাঁর প্রতিটি শব্দ এক একটি ছন্দ, তাঁর প্রতিটি বাক্য এক একটি অমর কবিতা। তিনি যখন কথা বলেন, তখন লক্ষ লক্ষ মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শ্রবণ করে। শেখ মুজিব কেবল একজন রাজনীতিক নন, তিনি একজন সুনিপুণ কবি—যিনি রাজনীতির মাঠকে সাহিত্যের মঞ্চে রূপান্তর করেছেন।
লেখক: পেশাজীবী ও কলামিস্ট।
মন্তব্য করুন