ঢাকা সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২৩ চৈত্র ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

০৫ এপ্রিল ১৯৭১: বহুমুখী যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০১ পিএম
০৫ এপ্রিল ১৯৭১: বহুমুখী যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দশম দিন। এই দিনটি ছিল উত্তাল ও প্রতিরোধের এক অনন্য অধ্যায়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্যাতন চালাচ্ছিল, মুক্তিযোদ্ধারা ও সাধারণ জনগণ অসীম সাহস ও বীরত্বের সাথে তাদের মোকাবিলা করে। সারাদেশে প্রতিরোধ যুদ্ধের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে।

প্রতিরোধ যুদ্ধের অগ্রগতি

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট-বড় যুদ্ধ ও প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।

ঢাকায় কারফিউ শিথিল ও গণপরিত্যাগ

ঢাকায় কারফিউর মেয়াদ ভোর পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত শিথিল করা হলে হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে দলে দলে ঢাকা ত্যাগ করে। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে, "প্রদেশের পরিস্থিতি সশস্ত্র বাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন রয়েছে। সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারীদের (মুক্তিযোদ্ধাদের) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবলম্বন করা হচ্ছে। পাকিস্তান বিরোধীদের বিরুদ্ধেও যথোচিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে"।

কুষ্টিয়ায় বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ

যশোর থেকে কুষ্টিয়ার পথে যাওয়ার সময় বিশাখালিতে পাকিস্তানি সেনাদের একটি কাফেলা (৯টি ট্রাক ও ২টি জিপ) মুক্তিবাহিনীর অ্যামবুশের মুখে পড়ে। সেখানকার স্থানীয় কৃষকদের আক্রমণে বহরের সব পাকিস্তানি সৈন্য প্রাণ হারায়। পরবর্তীতে পাকিস্তানি বাহিনী যশোর সেনানিবাস থেকে বিশাখালিতে পাল্টা আক্রমণ চালালে মুক্তিযোদ্ধারা নির্ভিকভাবে তা মোকাবিলা করে শত্রুসেনাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

শেরপুর-শাদীপুর ও সিলেটের যুদ্ধ

মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত তাঁর দুই কোম্পানি নিয়ে শেরপুর-শাদীপুর থেকে প্রধান সড়ক হয়ে এবং ক্যাপ্টেন আজিজের নেতৃত্বে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলের নিয়মিত সৈনিকরা শ্রীমঙ্গল-কুলাউড়া-কমিগঞ্জ ও চরখানাই পথ ধরে সিলেটের দিকে তৎপরতা শুরু করে।

শেরপুর-শাদীপুর এলাকায় পাকসেনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ বাঁধে। এতে তিন প্লাটুন পাকসৈন্যের অধিকাংশই মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হয়। ইলাশপুর গ্রামের দালাল ছাওলা মিয়ার ধানের গোলায় একজন পাকসেনা লুকিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করলে গ্রামবাসীরা তাকে খুঁজে বের করে হত্যা করে। এ যুদ্ধে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

সিলেটের সুরমা নদীর দক্ষিণ পারে এক খণ্ড যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাকবাহিনী পরাজিত হয় এবং তারা পালিয়ে গিয়ে শালুটিকর বিমান ঘাঁটিতে একত্র হয়। ফলে সুরমা নদীর সমগ্র দক্ষিণাঞ্চল এবং উত্তর সিলেট শহর শত্রুমুক্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়।

ঢাকায় গেরিলা হামলা

রাত আটটায় মুক্তিযোদ্ধারা যাত্রাবাড়ি রোডে পাকসেনা বোঝাই একটি গাড়ি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। সাথে সাথে ঢাকা ও ডেমরা থেকে পাকসেনাদের বহর ঘটনাস্থলের দিকে অগ্রসর হয়ে গোলাবর্ষণ শুরু করে। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি—তারা আক্রমণ চালিয়েই সাথে সাথে গ্রামের দিকে চলে যায়।

দিনাজপুর ও সৈয়দপুরে প্রতিরোধ

দিনাজপুরের ৮ উইং-এর সুবেদার আবদুল মজিদের নেতৃত্বে এক কোম্পানি ইআর ও ৯ উইং-এর আরেক প্লাটুন ইপিআর সৈয়দপুর-নীলফামারী সদর রাস্তার দারোয়ানি এলাকায় প্রতিরক্ষা ঘাঁটি গড়ে তোলে। পাকবাহিনী ১১টি গাড়ি নিয়ে ভূষিরবন্দর অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটির দিকে অগ্রসর হলে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলির মুখে পড়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

তবে “দশ মাইল” এলাকায় পাকিস্তানিদের সাঁজোয়া ও গোলন্দাজ বাহিনীর অতর্কিত হামলায় অনেক বাঙালি ইপিআর সদস্য শাহাদাত বরণ করেন এবং অনেকে আহত হন।

পাহারতলীর নৃশংসতা

চট্টগ্রামের পাহারতলী রেলওয়ে এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী তাদের বর্বরোচিত চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। তারা রেলের চিফ ইঞ্জিনিয়ার মোজাম্মেল চৌধুরী, অ্যাকাউন্টস অফিসার আব্দুল হামিদ, এল.আর. খান এবং তাঁদের পরিবারের সদস্য ও ভৃত্যসহ মোট ১১ জন বাঙালিকে জবাই করে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও রাজনৈতিক ঘটনা

এই দিনটি ছিল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আলোড়ন সৃষ্টিকারী।

যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সে আলোচনা

লন্ডনের হাউস অব কমন্সের সভায় ডগলাস হিউম ও অন্যান্য সদস্যরা পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শক্তি প্রয়োগের তীব্র সমালোচনা করেন। ডগলাস হিউম বলেন, "[পূর্ব পাকিস্তানে] কী ঘটেছে, সে সম্পর্কে আমাদের কাছে সম্পূর্ণ তথ্য না থাকলেও এটা সন্দেহাতীত যে সেখানে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আমি আশা করছি, এই সংঘাত বন্ধ করতে পুরো হাউস ও দেশই আমার সঙ্গে পাকিস্তান সরকারকে আহ্বান জানাবে"।

সভার সদস্যরা পাকিস্তানের ঘটনাকে তাদের অভ্যন্তরীণ ঘটনা বলে আখ্যায়িত করলেও পাকিস্তান সরকারকে উদ্ভূত পরিস্থিতি মীমাংসায় রাজনৈতিক সমঝোতাকে বেছে নিতে অনুরোধ করে।

মার্কিন সাময়িকী নিউজউইকের প্রতিবেদন

বিশ্বখ্যাত মার্কিন সাময়িকী নিউজউইক ৫ এপ্রিল, ১৯৭১-এ "রাজনীতির কবি" শিরোনামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুকে "যুদ্ধবিধ্বস্ত বাঙালি জাতির একজন নেতা" হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় এবং উল্লেখ করা হয় যে, "বাঙালিরা যৌক্তিক লড়াই করে যাচ্ছিলো দীর্ঘদিন ধরে জাতীয়তাবাদের জন্য"।

প্রতিবেদনে নিউজউইকের সাংবাদিক লোরেন জেঙ্কিন্সকে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের উল্লেখ থাকে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, "পরিস্থিতি উত্তরণের কোনো আশাই আর নেই। দেশের অবস্থা সম্পর্কে আমরা যতটা অবগত তাতে বলতে হয়, পাকিস্তান ধ্বংস হয়ে গেছে"। বঙ্গবন্ধু আরও প্রশ্ন রেখেছিলেন, "এ চেতনাকে মেশিনগান দিয়ে দমানো সম্ভব বলে কি আপনাদের ধারণা?"

ভুট্টোর বিবৃতি

করাচীতে পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো এক বিবৃতিতে দাবি করেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান গঠন করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু সেজন্যেই জাতীয় পরিষদের দুটি কমিটি গঠনের সুপারিশ করেছিলেন।

গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা: সাবমেরিন ‘মনগ্রো’-এর বাঙালি নাবিকদের বিদ্রোহ

এদিনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ফ্রান্সের তউলন বন্দরে। পাকিস্তানি সাবমেরিন ‘মনগ্রো’-তে কর্মরত ৪৫ জন নাবিকের মধ্যে ১৩ জন বাঙালি নাবিক পাকিস্তান নৌবাহিনীর প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।

তারা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সাবমেরিন ত্যাগ করে গোপনে সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। বিদেশের মাটিতে এই বিদ্রোহ বিশ্ববাসীকে জানান দেয় যে, পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন বাঙালিরা আর মানছে না।

৫ এপ্রিলের ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে, যুদ্ধ তখন কেবল সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে বিদেশের মাটিতে থাকা নৌ-সেনারাও যার যা আছে তাই নিয়ে বিদ্রোহ শুরু করেছিলেন। পাকিস্তানিরা ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে’ বলে দাবি করলেও বাস্তব চিত্র ছিল তাদের পরাজয় ও প্রতিরোধের জয়জয়কার। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এই বিষয়টি উঠে আসা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত ছিল না—এটি ছিল বিশ্বব্যাপী ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রশ্ন।

তথ্যসূত্র

১. মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আর্কাইভ।

২. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (চতুর্থ ও নবম খণ্ড)।

৩. আর্চার ব্লাড: দ্য ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ।

৪. এ এস এম শামসুল আরেফিন: মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি ও ঘটনা।

৫. দৈনিক পাকিস্তান ও সমকালীন আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদন (৫ এপ্রিল ১৯৭১)

৬. হাউস অব কমন্স সভার কার্যবিবরণী, ৫ এপ্রিল ১৯৭১

৭. নিউজউইক ম্যাগাজিন, ৫ এপ্রিল ১৯৭১

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

০৫ এপ্রিল ১৯৭১: বহুমুখী যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

১০

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

১১

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

১২

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

১৩

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

১৪

জামায়াতকে বিচারের আওতায় আনার দাবি / একাত্তরের গণহত্যা স্বীকৃতির প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে

১৫

২৩ মার্চ ১৯৭১: যেদিন পাকিস্তান দিবস হলো প্রতিরোধের নামে

১৬

২২ মার্চ ১৯৭১: আপসহীন সংগ্রামের ঘোষণা এবং ইয়াহিয়ার নতুন চাল

১৭

২১ মার্চ ১৯৭১: নীতির প্রশ্নে আপসহীন বঙ্গবন্ধু এবং ঘনীভূত সামরিক মেঘ

১৮

২০ মার্চ ১৯৭১: টেবিলে আশার আলো, অন্তরালে গণহত্যার নীল নকশা

১৯

১৯ মার্চ ১৯৭১: সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ ও বীরত্বগাঁথা

২০