ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

এস এম কামরুজ্জামান সাগর
প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম
ছবি: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

আজ ২৯ মার্চ। ১৯৫১ সালের এই দিনে জন্ম নিয়েছিলেন এক অকুতোভয় তরুণ, যার নাম শাফী ইমাম রুমী। ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যিনি বিলাসিতা, উচ্চশিক্ষা আর নিশ্চিত উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বেছে নিয়েছিলেন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার কঠিন পথ। আজ তাঁর জন্মদিনে কেবল শোক নয়, বরং তাঁর সেই বীরত্বগাথাকে নতুন করে পাঠ করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।

রুমী ছিলেন অসম্ভব মেধাবী। ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ভর্তি হয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। ঠিক সেই সময়েই তাঁর সামনে সুযোগ আসে আমেরিকার ইলিনয় ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে উচ্চশিক্ষার। স্কলারশিপ, পাসপোর্ট, ভিসা—সবই তৈরি ছিল। কিন্তু ভাগ্যবিধাতা হয়তো অন্য কিছু লিখেছিলেন। একাত্তরের মার্চে যখন দেশ জ্বলছে, তখন রুমী বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার কথা ভাবতেও পারেননি।

মা জাহানারা ইমামকে রাজি করানোর জন্য তাঁর সেই ঐতিহাসিক উক্তিটি আজও আমাদের প্রতিটি সংকটে দিশা দেখায়— "মা, দেশের এই অবস্থায় আমি যদি বিদেশে পড়তে যাই, তবে ফিরে এসে কি আমি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব?" এক প্রবল দেশপ্রেমের কাছে হার মেনেছিলেন মা; বিদায় দিলেন, কপালে এঁকে দিলেন বিজয়ের তিলক।

ভারতের ত্রিপুরার মেলাঘরে গেরিলা প্রশিক্ষণ শেষে রুমী ফিরে আসেন ঢাকায়। যোগ দেন কিংবদন্তি 'ক্র্যাক প্লাটুন'-এ। সেক্টর-২ এর অধীনে এই ছোট ছোট গেরিলা দলগুলো ছিল পাকিস্তানি সেনাদের কাছে সাক্ষাৎ যম। রুমী কেবল একজন যোদ্ধাই ছিলেন না, তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি আর কারিগরি জ্ঞান ঢাকাকেন্দ্রিক গেরিলা যুদ্ধে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

আগস্ট মাসে সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে হামলা কিংবা ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে দুঃসাহসী আক্রমণ—প্রতিটি অপারেশনেই রুমী ছিলেন সম্মুখসারিতে। পাকিস্তানি বাহিনী যখন ভেবেছিল ঢাকা সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে, তখন রুমীদের স্টেনগানের গর্জন জানিয়ে দিয়েছিল—বাংলাদেশ অজেয়।

১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট দিবাগত রাতে রুমীদের এলিফ্যান্ট রোডের বাড়িতে হানা দেয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। রুমী, তাঁর বাবা শরীফ ইমাম এবং ভাই জামীসহ পরিবারের অনেককে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় রমনা থানায়। অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েও রুমী তাঁর কোনো সহযোদ্ধার নাম প্রকাশ করেননি।

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, পাকিস্তানিরা রুমীর জীবনের বিনিময়ে একটি শর্ত দিয়েছিল—ক্ষমা চেয়ে মুচলেকা দিতে হবে। কিন্তু রুমী এবং তাঁর পিতা শরীফ ইমাম সেই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁরা জানতেন, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করার চেয়ে মৃত্যু অনেক বেশি গৌরবের। ৩০ আগস্টের পর রুমীকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি হারিয়ে গেলেন একাত্তরের সেই রক্তিম দিনগুলোতে, যেখান থেকে আর কোনোদিন ফিরে আসেননি।

রুমীর এই আত্মত্যাগই শান্ত এক মা জাহানারা ইমামকে রূপান্তরিত করেছিল 'শহীদ জননী'তে। রুমীর চলে যাওয়া কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি ছিল না, তা ছিল একটি আদর্শের জন্ম। পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে বিশাল জনমত গড়ে উঠেছিল, তার মূলে ছিল রুমীর রক্ত আর তাঁর মায়ের অদম্য জেদ।

আজকের দিনে আমরা যখন সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, তখন রুমীর মতো তরুণদের ত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা সস্তা নয়। রুমী কোনোদিন ফিরে আসেননি, কিন্তু তিনি রেখে গেছেন একটি স্বাধীন মানচিত্র এবং লাল-সবুজের পতাকা। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, এই বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম ইতিহাসের পাতায় ধ্রুবতারার মতো জ্বলবে।

স্যালুট—হে বীর। আপনার রক্তে কেনা এই বাংলায় আপনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

লেখক: নির্মাতা, সংগঠক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘অসৎ মানুষের হাতে এআই গেলে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে’

১

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র / বাংলাদেশে জ্বালানি নিয়ে আসা বিমানকে আকাশসীমায় ঢুকতে দেয়নি পাকিস্তান

২

শহীদ তাজুলের স্মৃতিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তরুণ প্রজন্ম

৩

ফুলেল শ্রদ্ধায় শহীদ মিনারে আখতার হুসেনকে শেষবিদায়

৪

রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে এগিয়ে পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া

৫

জামায়াত এমপি নজরুলের বাসায় উদ্ধারকৃত চিঠিতে মরিয়মের যা লেখা

৬

জামায়াত এমপি নজরুলের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও প্ররোচনার মামলা

৭

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড: কবিতা, গান ও ক্যানভাসে শরণার্থী জীবনের করুণ আখ্যান

৮

যুক্তরাষ্ট্রকে ৭ শর্ত দিল ইরান, না মানলে ‘চূড়ান্ত যুদ্ধ’

৯

নজিরবিহীন জালিয়াতি / বাংলাদেশ ব্যাংকে পদ ছাড়াই ৩৬৫ জনের নিয়োগ ও পদোন্নতি

১০

অপ্রতিম হত্যা: কিশোর গ্যাং, অপরাধ চক্র ও পুলিশের ভূমিকা

১১

আজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’

১২

‘বারবার মামলা না দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলেন’

১৩

আসিফের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক

১৪

সিঙ্গাপুরেও মিলল বাড়ি ও ব্যাংক হিসাব / সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ১০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি সম্পদ জব্দ

১৫

​​​​​​​শীতলক্ষ্যায় নিখোঁজ চারজনের মধ্যে ৩ জনের লাশ উদ্ধার

১৬

মোদী-পেজেশকিয়ান বৈঠক: মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সংলাপ ও নিরাপদ সমুদ্রপথের তাগিদ

১৭

গুলশানে আ’লীগের মিছিল, গ্রেপ্তার ৩২

১৮

সমকাল কার্যালয়ে সাবেক ব্যুরো প্রধানের লাশ উদ্ধার

১৯

রংপুরে চার খুন: নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা, গৃহশিক্ষিকা ও পুলিশ কর্মকর্তা

২০