ঢাকা সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

১২ এপ্রিল ১৯৭১: সরকারের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ও বালারখাইলের রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
১২ এপ্রিল ১৯৭১: সরকারের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ও বালারখাইলের রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি

১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই দিনটি একই সঙ্গে গৌরব ও চরম শোকের বার্তা বহন করে। একদিকে এদিন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের মন্ত্রিসভা ও সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ড কাঠামো ঘোষিত হয়, অন্যদিকে নীলফামারীর সৈয়দপুরে সংগঠিত হয় ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য ‘বালারখাইল গণহত্যা’।

স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভা ঘোষণা

১২ এপ্রিল রাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এক ঐতিহাসিক ঘোষণায় বাংলাদেশের প্রথম সরকারের যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার নাম ও দায়িত্ব বণ্টন করা হয়।

রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

উপ-রাষ্ট্রপতি: সৈয়দ নজরুল ইসলাম (বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান)।

প্রধানমন্ত্রী: তাজউদ্দীন আহমদ।

মন্ত্রিসভার সদস্য: খন্দকার মোশতাক আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান।

একই দিনে রণাঙ্গনকে সুশৃঙ্খল করতে কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি (C-in-C) হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

বালারখাইল গণহত্যা: বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রথম নীলনকশা

ঢাকার রায়েরবাজার বধ্যভূমির অনেক আগেই পাকিস্তানি বাহিনী নীলফামারীর সৈয়দপুরে পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যার সূত্রপাত ঘটায়। ২৫ মার্চ থেকে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি থাকা প্রায় ১৫০ জন বাঙালি বুদ্ধিজীবীকে টানা ১৮ দিন অমানুষিক নির্যাতনের পর ১২ এপ্রিল মধ্যরাতে রংপুর সেনানিবাসের নিকটবর্তী নিসবেতগঞ্জের ‘বালারখাইল’ নামক স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. জিকরুল হক, ডা. শামসুল হক, ডা. বদিউজ্জামান এবং বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ তুলসীরাম আগরওয়ালাসহ প্রায় দেড়শ জন গুণী মানুষকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান বিহারি কাইয়ুমের নির্দেশে সংগঠিত এই হত্যাকাণ্ডের মূল লক্ষ্য ছিল সৈয়দপুর শহরকে বুদ্ধিজীবীশূন্য করে দেওয়া। সেদিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া কমলা প্রসাদের সাক্ষ্য থেকে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ জানা যায়।

ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

১২ এপ্রিল ঢাকায় প্রথম বড় ধরনের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মিছিল বের হয়। গোলাম আযমের নেতৃত্বে বায়তুল মোকাররম থেকে বের হওয়া এই মিছিলে পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগান দেওয়া হয় এবং হানাদার বাহিনীর সাফল্য কামনা করে মোনাজাত করা হয়।

অন্যদিকে, ঢাকার এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে বিখ্যাত ‘টাইম’ (Time) ম্যাগাজিন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ঢাকার ধ্বংসলীলা আক্ষরিক অর্থেই এক রক্তস্নান, যা চেঙ্গিস খানের নৃশংসতাকেও হার মানায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৯ জন বিশিষ্ট নাগরিকও এদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে সামরিক বল প্রয়োগ বন্ধের দাবি জানিয়ে বার্তা পাঠান।

রণাঙ্গনের চিত্র: আক্রমণ ও প্রতিরোধ

এদিন সারা দেশে পাকিস্তানি বাহিনীর ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তোলেন:

উত্তরবঙ্গ: লালমনিরহাট বিমানবন্দরে সুবেদার আরব আলীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাকঘাঁটিতে বড় ধরনের আক্রমণ চালায়। রাজশাহীর নাটোরে তুমুল আক্রমণের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা বানেশ্বরে অবস্থান নেয়।

রাজশাহী ও ঈশ্বরদী: নায়েক সুবেদার লস্কর সিরাজউদ্দীন ও ক্যাপ্টেন গিয়াসের নেতৃত্বে পাবনার নগরবাড়ীতে পাকবাহিনীর গতিরোধ করার চেষ্টা করা হয়। পুঠিয়ার বিড়ালদহে ৭ ঘণ্টার যুদ্ধে ৪২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

দক্ষিণাঞ্চল: যশোরের ঝিকরগাছায় ইপিআর ও বিএসএফ-এর যৌথ প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানিরা আর্টিলারি হামলা চালায়। এতে ইপিআর-এর দুজন ও বিএসএফ-এর একজন সদস্য শহীদ হন।

চট্টগ্রাম: ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নের সদস্যরা কালুরঘাট থেকে পিছু হটে রাঙামাটির মহালছড়িতে নতুন হেডকোয়ার্টার স্থাপন করে।

সামরিক কর্তৃপক্ষের আল্টিমেটাম

ঢাকার সামরিক কর্তৃপক্ষ এদিন এক ফরমান জারির মাধ্যমে সব সরকারি ও আধা-সরকারি কর্মচারীকে ২১ এপ্রিলের মধ্যে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। অন্যথায় তাদের বরখাস্ত করার হুমকি দেওয়া হয়। একই সময় মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর বেতার ভাষণে মুক্তিযোদ্ধাদের বিন্দুমাত্র দয়া না দেখিয়ে হত্যার আহ্বান জানান।

১২ এপ্রিল ১৯৭১ ছিল একদিকে জাতির প্রশাসনিক ভিত্তি মজবুত করার দিন, অন্যদিকে মেধাবী সন্তানদের হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার দিন। বালারখাইলের রক্ত আর স্বাধীন সরকারের শপথ—এই দুইয়ের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ তার চূড়ান্ত বিজয়ের পথে ধাবিত হতে শুরু করে।

তথ্যসূত্র

১. বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র (ত্রয়োদশ খণ্ড)।

২. বালারখাইল গণহত্যা — আহম্মেদ শরীফ।

৩. দৈনিক পাকিস্তান ও আনন্দবাজার পত্রিকা (১৩ এপ্রিল ১৯৭১)।

৪. সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস (সেক্টর ২, ৭ ও ৮)।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

১২ এপ্রিল ১৯৭১: সরকারের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ও বালারখাইলের রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি

রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা: পাবনার এক রক্তাক্ত অধ্যায়

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাজউদ্দীন আহমদের প্রথম ভাষণ

১১ এপ্রিল ১৯৭১: তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ ও সংগঠিত প্রতিরোধের সূচনা

১০ এপ্রিল ১৯৭১: বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও স্বাধীনতার সনদ

১০ এপ্রিল ১৯৭১: যখন যুদ্ধের অন্ধকারে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনি সূর্য

০৫ এপ্রিল ১৯৭১: বহুমুখী যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

১০

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

১১

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

১২

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

১৩

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

১৪

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

১৫

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

১৬

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

১৭

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

১৮

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

১৯

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

২০