

আসিয়ানভুক্ত হওয়ার দীর্ঘদিনের স্বপ্নে বড় ধাক্কা খেল বাংলাদেশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রভাবশালী এই জোটের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে স্পষ্ট বার্তা এসেছে—ভৌগোলিক শর্ত পূরণ করতে না পারায় বাংলাদেশ কিংবা পাপুয়া নিউগিনির সদস্য হওয়ার সম্ভাবনা এখন কার্যত শূন্যের কোঠায়।
ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত ১০ম আসিয়ান মিডিয়া ফোরামে (ASEAN Media Forum) আসিয়ানের মহাসচিব কাও কিম হুন সরাসরি জানিয়ে দেন, বিদ্যমান সনদ অনুযায়ী বাংলাদেশের আসিয়ানভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তিনি বলেন, “আসিয়ান সনদ অনুযায়ী কেবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত দেশগুলোই সদস্যপদের যোগ্য।” বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার এবং পাপুয়া নিউগিনি ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশ হওয়ায় উভয়েই এই শর্ত পূরণ করে না বলে জানান তিনি। ইন্দোনেশিয়ার সংবাদমাধ্যম জাকার্তা গ্লোব সর্বপ্রথম গত ৩১ জুলাই এই খবর প্রকাশ করে।
কাও কিম হুন জানান, তিমুর-লেস্তেকে অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়েই আসিয়ানের সম্প্রসারণ কার্যত সম্পন্ন হয়েছে এবং সনদ সংশোধন ছাড়া বর্তমান ১১ সদস্যের কাঠামোর বাইরে জোট বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সনদ সংশোধন করতে হলে জোটের সব সদস্য রাষ্ট্রের সর্বসম্মত অনুমোদন প্রয়োজন, যা সহজ প্রক্রিয়া নয়। এ প্রসঙ্গে সদ্য যুক্ত হওয়া তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট হোসে রামোস-হোর্তার একটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য—দীর্ঘ ও জটিল যোগদান প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি একসময় বলেছিলেন, “আসিয়ানে যোগ দেওয়ার চেয়ে স্বর্গে যাওয়া সহজ!”
পাপুয়া নিউগিনি ১৯৭৬ সাল থেকে আসিয়ানের পর্যবেক্ষক মর্যাদা ভোগ করলেও একই কারণে তাদের পূর্ণ সদস্যপদও অনিশ্চিত। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো ২০২৫ সালের কুয়ালালামপুর আসিয়ান সম্মেলনে পাপুয়া নিউগিনির অন্তর্ভুক্তির পক্ষে প্রকাশ্য সমর্থন জানালেও সনদের বাধা তাতে দূর হয়নি।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই আসিয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। গত বছর মালয়েশিয়ার আসিয়ান সভাপতিত্বকালে ঢাকা এই সদস্যপদ লাভে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছিল। তবে মহাসচিবের এই স্পষ্ট বক্তব্যে সেই আশা এখন কার্যত ভেঙে পড়ল।
আসিয়ানের লক্ষ্য যেখানে, বাধা সেখানেই
১৯৬৭ সালের ব্যাংকক ঘোষণায় নির্ধারিত আসিয়ানের মূল লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, সামাজিক অগ্রগতি ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সাধন, ন্যায়বিচার ও জাতিসংঘ সনদের নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আঞ্চলিক শান্তি-স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-কারিগরি ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় যৌথ সহায়তা, কৃষি-শিল্প-বাণিজ্য-পরিবহন খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান বাড়ানো, সদস্য দেশ ও বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য-বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অধ্যয়ন ও আঞ্চলিক পরিচয় সুদৃঢ় করা এবং সমমনা আন্তর্জাতিক-আঞ্চলিক সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রাখা। এই প্রতিটি লক্ষ্যই মূলত সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ, ফলে আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ ছাড়া বাংলাদেশ এসবের কোনোটিতেই পূর্ণ অংশীদার হতে পারে না।
বাংলাদেশের সামনে কী চ্যালেঞ্জ
সদস্যপদ না পাওয়ায় বাংলাদেশ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বহাল অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা, শুল্ক ছাড় ও যৌথ সরবরাহ-শৃঙ্খল থেকে বঞ্চিত থাকবে, যা প্রতিযোগী দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অর্থনীতিগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাড়তি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। আসিয়ান-কেন্দ্রিক আঞ্চলিক নীতিনির্ধারণী ফোরাম, যৌথ অবকাঠামো-সংযোগ প্রকল্প এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংলাপেও পূর্ণ অংশগ্রহণের সুযোগ অধরাই থেকে যাবে। এমনকি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতির যেকোনো নতুন উদ্যোগেও বাংলাদেশকে বাইরে থেকেই দর কষাকষি করতে হবে। ফলে পূর্ণ সদস্যপদের পরিবর্তে সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনারশিপ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি এবং পৃথক পৃথক সদস্য দেশের সঙ্গে সরাসরি অর্থনৈতিক কূটনীতির মতো বিকল্প পথেই এখন বেশি জোর দিতে হবে ঢাকাকে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যসূত্র
মন্তব্য করুন