

চৈত্রের খরতাপে যখন পুড়ছে জনপদ, ঠিক তখনই মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা এখন জ্বালানি সংকটের গোলকধাঁধায়। একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং—সব মিলিয়ে জনজীবন এখন বিপর্যস্ত। তবে পিডিবি ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) তথ্যের গরমিল এবং লোডশেডিং বণ্টনে বৈষম্যের অভিযোগ জনমনে ক্ষোভের বারুদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
‘বৈষম্যমূলক’ লোডশেডিংয়ের বলি গ্রামাঞ্চল
বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের তীব্র ঘাটতিতে দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্তত ৭১টিই এখন হয় অচল, নতুবা নামমাত্র উৎপাদনে ধুঁকছে। এর ফলে জাতীয়ভাবে ঘাটতির পরিমাণ দেড় হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও, প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছে তা রূপ নিয়েছে ৫-৬ ঘণ্টার অসহনীয় অন্ধকারে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম মনে করেন, এই সংকটের বড় কারণ ‘বৈষম্যমূলক বণ্টন’। তিনি বলেন, “শহুরে বাণিজ্যিক এলাকাগুলোকে সচল রাখতে গিয়ে গ্রামাঞ্চলের ফিডারগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি সময় বন্ধ রাখা হচ্ছে। বিতরণ ব্যবস্থার এই ত্রুটির কারণেই মাঝারি ঘাটতি গ্রামে বড় বিপর্যয় ডেকে আনছে।”
পরীক্ষার প্রস্তুতি ও কৃষি—উভয়ই সংকটে
এই লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় মাশুল দিচ্ছেন এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। ময়মনসিংহের গৃহবধূরা বলছেন, দিনের বেলা কোনোমতে চললেও রাতের অন্ধকারে ভ্যাপসা গরমে পড়াশোনা তো দূরের কথা, ঘুমানোও অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
কৃষিনির্ভর খুলনা ও রাজশাহী অঞ্চলের অবস্থা আরও ভয়াবহ। বটিয়াঘাটা ও দাকোপের চিংড়ি খামারিরা বিদ্যুৎহীনতার কারণে এ্যারেশন মেশিন চালাতে পারছেন না। অক্সিজেন সংকটে মারা যাচ্ছে মাছ, ঝুঁকির মুখে পড়েছে বিনিয়োগ। অন্যদিকে, বোরো মৌসুমের এই চরম সময়ে সেচ সংকটে দিশেহারা কৃষক। রংপুরের ব্যবসায়ীরা জেনারেটরের অতিরিক্ত খরচ মেটাতে গিয়ে দিশেহারা, যার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় পণ্যমূল্যের ওপর।
তথ্যের মারপ্যাঁচে গোলকধাঁধা
বিদ্যুৎ নিয়ে বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে সরকারি সংস্থাগুলোর পাল্টাপাল্টি তথ্যে। একদিকে জাতীয়ভাবে ঘাটতির হিসাব দেখানো হচ্ছে ১,৮৪০ মেগাওয়াট, অন্যদিকে আরইবির নিজস্ব তথ্যে গ্রামাঞ্চলে ঘাটতি দেখানো হচ্ছে ২,৮০০ মেগাওয়াটেরও বেশি।
পিডিবি সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম দাবি করেছেন, এই পার্থক্য খতিয়ে দেখতে কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং আরইবির তথ্য তারা আমলে নিচ্ছেন না। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত চাহিদার চেয়ে জ্বালানির সহজলভ্যতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করায় তথ্যে এই গরমিল তৈরি হয়েছে।
সমাধানের পথ কোথায়?
পিডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আসন্ন গ্রীষ্মে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত নেই। সংকট নিরসনে বিশেষজ্ঞরা কেবল উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর না দিয়ে, লোডশেডিং বণ্টনে স্বচ্ছতা এবং সুষম নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না, ফলে লোডশেডিং একটি অনিবার্য বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।” কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই বাস্তবতা কি সাধারণ মানুষের কাঁধে সমানভাবে পড়ছে? গ্রামাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘশ্বাস কি নীতি-নির্ধারকদের কান পর্যন্ত পৌঁছাবে?
বিদ্যুৎহীন রাত, গরমের উত্তাপ আর পরীক্ষার চাপ—এই ত্রিমুখী সংকটে পড়ে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন এখন অনেকটা স্থবির। কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া এই ‘অন্ধকার’ কবে কাটবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
মন্তব্য করুন