

১৯৭১ সালের ৫ মার্চ ছিল শুক্রবার। অসহযোগ আন্দোলনের পঞ্চম দিনে এসে বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন এক অপ্রতিরোধ্য গণবিস্ফোরণে রূপ নেয়। এদিন একদিকে যেমন ছিল লাশের মিছিল, অন্যদিকে ছিল শৃঙ্খল ভাঙার দুর্জয় শপথ।
১. রাজপথে লাশের মিছিল ও পাক-হানাদারের বর্বরতা
এদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাকিস্তানি বাহিনীর বুলেটে রক্তাক্ত হয় বাঙালি।
চট্টগ্রামে গণহত্যা: বীর চট্টলায় এদিন পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে ২২২ জন বাঙালি শহীদ হন। এটি ছিল সেই দিনের সবচেয়ে বড় রক্তপাত।
টঙ্গীর শ্রমিক আন্দোলন: টঙ্গীতে শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের ওপর সেনাবাহিনী নির্বিচারে গুলি চালালে ৪ জন শ্রমিক নিহত হন এবং ১৮ জন গুরুতর আহত হন।
যশোর ও অন্যান্য: যশোরেও পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে একজন মুক্তিকামী যুবক প্রাণ হারান। সারা দেশে এই হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে মানুষের ক্ষোভ দাবানলের মতো জ্বলে ওঠে।
২. ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ভেঙে বন্দিদের পলায়ন
৫ মার্চ দুপুরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এক অভাবনীয় বিদ্রোহ ঘটে। স্বাধীনতার স্লোগান দিতে দিতে ৩২৫ জন কয়েদি কারাগারের গেট ভেঙে বেরিয়ে আসেন। তারা সরাসরি মিছিল করে শহীদ মিনারে গিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেওয়ার শপথ নেন। তবে কারাফটক ভাঙার সময় প্রহরীদের গুলিতে ৭ জন কয়েদি প্রাণ হারান।
৩. রাজনৈতিক অঙ্গন ও বঙ্গবন্ধুর কঠোর অবস্থান
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের অঘোষিত শাসক।
গুজব নাকচ: রাতে বিদেশি গণমাধ্যমে প্রচারিত হয় যে, "বঙ্গবন্ধু ও ভুট্টো ক্ষমতা ভাগাভাগিতে রাজি হয়েছেন।" বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিক এক বিবৃতিতে এই সংবাদকে ‘কল্পনার ফানুস’ বলে উড়িয়ে দেন।
তাজউদ্দীন আহমদের হুঁশিয়ারি: আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে নির্বিচারে মানুষ হত্যাকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
আসগর খানের আগমন: পশ্চিম পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল আসগর খান করাচি থেকে ঢাকা এসে রাতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তাঁর সঙ্গে জরুরি সাক্ষাৎ করেন।
৪. পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া ও ষড়যন্ত্র
ইয়াহিয়া-ভুট্টো বৈঠক: রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ভবনে পিপলস পার্টি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে ৫ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন।
ভুট্টোর মনোভাব: ভুট্টো তখন ২০ হাজার বাঙালির লাশ ফেলে হলেও আন্দোলন দমানোর পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁর মুখপাত্র পীরজাদা আওয়ামী লীগের অসহযোগ আন্দোলনকে ‘অবাঞ্ছিত ও অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেন।
৫. পেশাজীবী ও ছাত্র সমাজের প্রতিরোধ
বুদ্ধিজীবীদের শপথ: অধ্যাপক আহমদ শরীফের নেতৃত্বে কবি, সাহিত্যিক ও শিক্ষকরা শহীদ মিনারে সমবেত হয়ে স্বাধীনতার শপথ নেন।
ছাত্রলীগের লাঠি মিছিল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় ছাত্রলীগ বিশাল লাঠি মিছিল বের করে। ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ ঢাকা বেতারের প্রতি কড়া নির্দেশ দেন যেন ৭ মার্চের ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
পতাকা উত্তোলন: এদিন দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রথমবারের মতো মানচিত্র খচিত ‘স্বাধীন বাংলার পতাকা’ উত্তোলন করা হয়।
৬. প্রশাসনিক ও সামাজিক চিত্র
ব্যাংক লেনদেন: বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে হরতাল চলাকালীন সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য ব্যাংকগুলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খোলা রাখা হয়।
প্রার্থনা ও মোনাজাত: দিনটি শুক্রবার হওয়ায় জুমার নামাজের পর দেশের প্রতিটি মসজিদে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত এবং দেশমুক্তির কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
সেনাবাহিনী ব্যারাকে: ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মুখে সন্ধ্যাবেলা সরকারিভাবে ঘোষণা দেওয়া হয় যে, ঢাকা শহর থেকে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
৫ মার্চের ঐতিহাসিক তাৎপর্য
৫ মার্চের এই ঘটনাবলী প্রমাণ করে যে, বাঙালির আন্দোলন আর কেবল স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি স্পষ্টতই সশস্ত্র স্বাধীনতার দিকে ধাবিত হচ্ছিল। সাধারণ কয়েদি থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী—সবার লক্ষ্য ছিল একটাই: একটি স্বাধীন মানচিত্র।
"ক্ষমতার দুর্গ নয়, জনগণই যে দেশের সত্যিকার শক্তির উৎস, বাংলাদেশের বিগত তিন দিনের ঘটনাবলী নিঃসন্দেহে তা সপ্রমাণিত করেছে।" — (তৎকালীন রাজনৈতিক ভাষ্যকারের পর্যবেক্ষণ)
মন্তব্য করুন