
বাঙালির ইতিহাসে মার্চ মানেই এক পংক্তিহীন মহাকাব্য। এটি যেমন শোক ও তিমির রজনীর বেদনায় সিক্ত, তেমনি শৃঙ্খল ভাঙার অদম্য সাহসে ভাস্বর। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২৩ বছরের পাকিস্তানি শোষণ-বঞ্চনার নাগপাশ ছিঁড়ে ফেলার চূড়ান্ত ক্ষণ ছিল ১৯৭১-এর এই মার্চ। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, বরং বাঙালির আত্মপরিচয় ও বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়স্থল।
১ মার্চের আকস্মিকতা ও অসহযোগের ডাক
১৯৭১ সালের ১ মার্চ। পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া খান পূর্বনির্ধারিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করলে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বাংলার আপামর জনতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম উত্তোলিত হয় বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ঘোষিত হয় স্বাধীনতার ইশতেহার। রাজপথ তখন স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত— “বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।”
৭ মার্চের বজ্রকণ্ঠ: মুক্তির মহাকাব্য
তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” মাত্র ১৮ মিনিটের সেই ভাষণ ছিল একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র যোদ্ধায় রূপান্তরিত করার জাদুকরী মন্ত্র। এরপর থেকেই ঘরে ঘরে শুরু হয় যুদ্ধের প্রস্তুতি।
অপারেশন সার্চলাইট: ইতিহাসের কলঙ্কিত জেনোসাইড
২৫শে মার্চ রাত ছিল বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও বর্বরোচিত অধ্যায়। ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করার পরপরই পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুমন্ত বাঙালির ওপর। পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চলে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। জগন্নাথ হল ও রোকেয়া হলের ধ্বংসস্তূপ আর বুড়িগঙ্গার রক্তস্রোত সাক্ষী হয়ে আছে সেই বিভীষিকার। ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং-এর লেখনীতে উঠে আসে সেই পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞের ভয়াবহ চিত্র।
জাতিসংঘের ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যার সংজ্ঞার প্রতিটি শর্ত পূরণ করেছিল সেই রাতের নিষ্ঠুরতা। এটি কেবল সামরিক দমন ছিল না, ছিল একটি জাতিকে জাতিসত্তাসহ নিশ্চিহ্ন করার নীলনকশা।
২৬শে মার্চ: প্রতিরোধের সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা
২৫শে মার্চ মধ্যরাতে অর্থাৎ ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে গ্রেফতার হওয়ার আগমুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পিপিআর-এর ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁর সেই ঘোষণা সারা বাংলায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় পাল্টা প্রতিরোধ। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়।
ষড়যন্ত্র ও ইতিহাসের দায়
স্বাধীনতার ৫ দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও পরাজয় মেনে নেয়নি সেই সময়ের দেশীয় দোসররা। রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসদের উত্তরসূরীরা আজও ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টায় লিপ্ত। যারা ‘পাকিস্তানি হানাদার’ শব্দবন্ধটি উচ্চারণে দ্বিধা বোধ করে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতায় লিপ্ত থাকে, তারা আজও এই রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে আঘাত হানতে চায়।
২৫শে মার্চ আমাদের অস্তিত্বের শেকড় খোঁজার দিন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘ ত্যাগের নির্যাস। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের এই সঠিক ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া এবং সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক, উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়াই হোক আজকের অঙ্গীকার।
মন্তব্য করুন