ঢাকা বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

মঙ্গল শোভাযাত্রার অবসান: অমঙ্গলের সংস্কৃতি!

আনিস আহম্মেদ
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৫, ০৬:২৯ পিএম
মঙ্গল শোভাযাত্রার অবসান: অমঙ্গলের সংস্কৃতি!

খবরে দেখলাম, এবারের নববর্ষে—এই পহেলা বৈশাখে—মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে পূর্বেকার নাম বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা করা হচ্ছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা কিংবা আনন্দ শোভাযাত্রা—কোনো নাম নিয়েই বিতর্কের অবকাশ থাকে না, যদি না সেই নাম পরিবর্তনের পেছনে একধরনের সাম্প্রদায়িক চিন্তাধারা কাজ করে। তবে অনেকেই জানেন না যে ধর্ম ও সংস্কৃতি এক জিনিস নয়।

সংস্কৃতি দেশ ও স্থানভিত্তিক, ধর্ম কোনো স্থানের অধীনে নয়। কাজেই একই ধর্মের অনুসারী ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি অনুসরণ করতে পারেন; আবার একই সংস্কৃতির মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের লোকের অবস্থান থাকতে পারে। সংস্কৃতি হচ্ছে একটি অসাম্প্রদায়িক সত্য ও সত্তা।

যারা 'মঙ্গল' শব্দটির মধ্যে ভিন্ন ধর্মের আভাস পান, তাঁরা কি জানেন যে আমাদের সপ্তাহের প্রতিটি দিনের নামের উৎপত্তি কোনো না কোনো দেব-দেবতার নাম অনুসারে? তাই বলে কি আমরা সপ্তাহের নামগুলো পরিহার করব? আর কেবল বাংলাই বা কেন—ইংরেজিতেও সপ্তাহের দিনগুলোর নাম প্রাচীন আমলের দেব-দেবীর নামানুসারে। কই, ইংরেজি সপ্তাহের দিনগুলোর নামের তো কোনো পরিবর্তন করা হয়নি! তবে 'মঙ্গল' নিয়ে এই অ্যালার্জি কেন?

আর 'মঙ্গল' শব্দটির যে ইতিবাচক অর্থ রয়েছে—যা অমঙ্গলের বিপরীত—সেটিও কি আমরা ভুলে যাবো? সংস্কৃতির মধ্যে ধর্মের প্রভাব খাটানো কোনো ক্রমেই সমীচীন নয়। এমনকি যে আরব দেশে ইসলাম ধর্মের উৎপত্তি, তারাও নিজেদের পরিচয় দেওয়ার সময় বলেন না যে তারা মুসলিম, তারা বলে তারা আরব। সেখানেও বিয়ের মতো শুভ অনুষ্ঠানে উলুধ্বনি দেওয়া হয়—ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই তা করে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছে ভাষা ও সংস্কৃতির মুক্তির আহ্বান থেকে। ’৫২-র ভাষা আন্দোলন কিংবা ’৬১-তে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের আন্দোলনই বাঙালিকে তার জাতিসত্তার পরিচয় দিয়েছে।

মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? 'মঙ্গল' যদি পরিত্যাজ্য হয়, তবে 'আনন্দ'ও কি সংস্কৃতিজাত শব্দ নয়?

আর সাংস্কৃতিক এই বিশাল উদযাপনকে যারা রাজনীতির রঙে রাঙাতে চান, তারাও ভুল করছেন। প্রতীকী মুখোশ কিংবা মূর্তি থাকতেই পারে, কিন্তু তা যেন কল্যাণের বার্তা বহন করে। কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের ব্যঙ্গাত্মক কিছু থাকলে, তা সার্বজনীন আনন্দকেই বিভাজিত করতে পারে।

বর্ষবরণের এই শোভাযাত্রার নাম যাই হোক না কেন, তা যেন সকল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য মঙ্গলের বার্তা বয়ে আনুক—সেটিই কাম্য। আমরা যেন সকলে মিলে গাইতে পারি:

“এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার আজি প্রাতে সূর্য ওঠা সফল হলো কার।”

সেই সাফল্যের সূর্যোদয়ের প্রত্যাশী বাংলাদেশের সকল বাঙালি।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

১০

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

১১

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

১২

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

১৩

জামায়াতকে বিচারের আওতায় আনার দাবি / একাত্তরের গণহত্যা স্বীকৃতির প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে

১৪

২৩ মার্চ ১৯৭১: যেদিন পাকিস্তান দিবস হলো প্রতিরোধের নামে

১৫

২২ মার্চ ১৯৭১: আপসহীন সংগ্রামের ঘোষণা এবং ইয়াহিয়ার নতুন চাল

১৬

২১ মার্চ ১৯৭১: নীতির প্রশ্নে আপসহীন বঙ্গবন্ধু এবং ঘনীভূত সামরিক মেঘ

১৭

২০ মার্চ ১৯৭১: টেবিলে আশার আলো, অন্তরালে গণহত্যার নীল নকশা

১৮

১৯ মার্চ ১৯৭১: সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ ও বীরত্বগাঁথা

১৯

১৮ মার্চ ১৯৭১: জান্তার তদন্ত কমিটি প্রত্যাখ্যান ও বঙ্গবন্ধুর ডাক

২০