

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্রের অন্যতম পথিকৃৎ, ভারতের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই। রবিবার নয়াদিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৩ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। দীর্ঘ দুই বছর ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন ইতিহাসের এই ক্যামেরাবন্দি সৈনিক।
রঘু রাইয়ের ছেলে আলোকচিত্রী নীতিন রাই জানান, দুই বছর আগে তাঁর প্রোস্টেট ক্যানসার ধরা পড়েছিল। শুরুতে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেও পরবর্তীতে তা পাকস্থলী ও মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে। শারীরিক জটিলতা ও বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় গত কয়েকদিন তিনি সংকটাপন্ন ছিলেন। রবিবার বিকালে দিল্লির লোধি রোড শ্মশানে এই কিংবদন্তির শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ দলিল
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন রঘু রাই ভারতের 'দ্য স্টেটসম্যান' পত্রিকার প্রধান আলোকচিত্র সাংবাদিক। বিদেশি আলোকচিত্রীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম, যিনি যুদ্ধের ভয়াবহতা ও বাঙালির সংগ্রামের চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিলেন। ভারতের বিভিন্ন শরণার্থীশিবিরে উদ্বাস্তু বাংলাদেশিদের অবর্ণনীয় কষ্ট ও জীবনযাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত তিনি তাঁর ক্যামেরায় নিখুঁতভাবে ধারণ করেছেন।
শুধু শরণার্থীশিবির নয়, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি সরাসরি বাংলাদেশে প্রবেশ করে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন, চূড়ান্ত বিজয়ের পর বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক দৃশ্যগুলো ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সেই অমূল্য দলিলগুলোর জন্য ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশটির চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ প্রদান করে।
আলোকচিত্রের জাদুকর
১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর অবিভক্ত ভারতের ঝাংয়ে (বর্তমানে পাকিস্তানে) জন্মগ্রহণ করেন রঘু রাই। ২৩ বছর বয়সে বড় ভাই আলোকচিত্রী এস পলের অনুপ্রেরণায় তিনি ক্যামেরাকে পেশা ও শিল্পের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। দীর্ঘ ছয় দশকের ক্যারিয়ারে তিনি কেবল ছবি তোলেননি, মানুষ আর সময়ের গল্পকে ইতিহাসের পাতায় গ্রন্থিত করেছেন।
১৯৭৭ সালে কিংবদন্তি ফরাসি আলোকচিত্রী অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসঁর সুপারিশে তিনি বিশ্বখ্যাত ‘ম্যাগনাম ফটোস’-এ যোগ দেন। তাঁর ক্যামেরায় ইন্দিরা গান্ধী, মাদার তেরেসা, সত্যজিৎ রায় ও দালাই লামার মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে। ‘ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডি’র পর তাঁর তোলা ছবিগুলো বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
কর্মজীবনে তিনি ‘ইন্ডিয়া টুডে’ ম্যাগাজিনের ডিরেক্টর অফ ফটোগ্রাফি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ‘ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন। ২০১৯ সালে আলোকচিত্র জগতের অন্যতম শীর্ষ আন্তর্জাতিক সম্মান ‘অ্যাকাডেমি ডেস বিউক্স-আর্টস ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড’ পান তিনি।
সাধারণের মাঝে ‘অসাধারণ’ কিছু খুঁজে পাওয়ার জাদুকরী ক্ষমতা ছিল রঘু রাইয়ের। তাঁর মৃত্যুতে বিশ্ব আলোকচিত্র সাংবাদিকতায় এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী গুরমিত রাই এবং চার সন্তান নীতিন, লগন, অবনি ও পূর্বাইকে রেখে গেছেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশ ও ভারতের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মন্তব্য করুন