

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের এক প্রতিবাদ সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়। সিলেটে সাম্প্রতিক বোমা হামলার প্রতিবাদে আয়োজিত এই সমাবেশে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই ট্রাকমঞ্চ থেকে দুই গজ দূরে প্রথম গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হয়। এরপর দেড় মিনিটের মধ্যে মোট ১৩টি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়। সমাবেশে প্রায় ২৫ হাজার নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
হামলার সময় দলীয় নেতাকর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীরা মানববর্ম তৈরি করে শেখ হাসিনাকে ঘিরে রাখেন, ফলে তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান। তাকে দ্রুত বুলেটপ্রুফ গাড়িতে তুলে সরিয়ে নেওয়া হয়; গাড়িতে অন্তত সাতটি গুলি লাগে। শেখ হাসিনা সন্ধ্যা ৬টার দিকে নিজ বাসভবন সুধা সদনে পৌঁছান।
হামলার পরপরই বিক্ষুব্ধ জনতা বিজয়নগর, পুরানা পল্টন, দৈনিক বাংলা মোড়, জিরো পয়েন্ট, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, গোলাপ শাহ মাজার ও গুলিস্তান এলাকায় প্রায় ২০টি যানবাহনে আগুন দেয়। পুলিশ টিয়ারশেল ও লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। উদ্ধারকাজ চলাকালে সন্ধ্যা ৬টা ২৭ মিনিটে অবিস্ফোরিত আরেকটি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়। রাত সোয়া ৭টার দিকে ঢাকায় তৎকালীন বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) মোতায়েন করা হয়। আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ডিএমসিএইচ) নেওয়া হয়, যেখানে ১৫০ জনের বেশি আহতকে প্রাথমিকভাবে ভর্তি করা হয়; জায়গার অভাবে পরে অনেককে অন্য হাসপাতালে সরিয়ে নেওয়া হয়।
হামলায় সরাসরি ও পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট ২৪ জন নিহত হন। এদের মধ্যে ছিলেন মহিলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভানেত্রী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমান, যিনি বিস্ফোরণে দুই পা হারিয়ে ২৪ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়া নিহতদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগ ঢাকা মহানগর উপদেষ্টা রফিকুল ইসলাম এবং শেখ হাসিনার নিরাপত্তা কর্মীদের প্রধান ল্যান্স কর্পোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ, যিনি হাসিনাকে রক্ষা করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। আহতদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, কাজী জাফরউল্লাহ, মোহাম্মদ নাসিম, মহিউদ্দিন খান আলমগীর, সাহারা খাতুন, তৎকালীন ঢাকা সিটি মেয়র মোহাম্মদ হানিফসহ ৩০০ জনের বেশি নেতাকর্মী।
ঘটনার পর মতিঝিল থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি মামলা হয়। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সিআইডি তদন্ত শেষে ২২ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলার অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়, এবং ২০১১ সালে দাখিল করা সম্পূরক অভিযোগপত্রে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ মোট ৩০ জনকে নতুন করে অভিযুক্ত করা হয়। ২০১২ সালে ট্রাইব্যুনাল হত্যা মামলায় ৫২ জন ও বিস্ফোরক আইনের মামলায় ৩৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে।
২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায় ঘোষণা করে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপশিক্ষামন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়, আর বাকি ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার সময় তারেক রহমানসহ ১৮ জন পলাতক ছিলেন, ৮ জন জামিনে ছিলেন এবং ২৩ জন কারাগারে ছিলেন।
সর্বশেষ অবস্থা
নিম্ন আদালতের মৃত্যুদণ্ডের রায় অনুমোদনের জন্য মামলার নথি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পাঠানো হয়; একই সঙ্গে আসামিদের জেল আপিল ও নিয়মিত আপিলও শুনানি হয়। ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর এই শুনানি শুরু হয়। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ যে সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে বিচার হয়েছিল তা অবৈধ ঘোষণা করে, ফলে ট্রাইব্যুনালের রায় কার্যকারিতা হারায়। আদালত ডেথ রেফারেন্স নাকচ করে এবং তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ সব আসামিকে খালাস দেয়। এই রায়ের পর বাবরকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করে। ২০২৫ সালের ১৭ ও ৩১ জুলাই এবং ১৯, ২০ ও ২১ আগস্ট শুনানি শেষে আপিল বিভাগ রায়ের জন্য ৪ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করে। সেদিন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল রাখে। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করে, তদন্তের সময় একই দিনে তিনজন আসামির জবানবন্দি নেওয়া অস্বাভাবিক ছিল। এই রায়ের মধ্য দিয়ে মামলাটি সর্বোচ্চ আদালতের পর্যায়ে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়; রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করা হবে কিনা তা পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছিল।
সম্পর্কিত মামলা
২০০৪ সালের ২১ জুন সুনামগঞ্জের দিরাই বাজারে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ওপর পৃথক আরেকটি গ্রেনেড হামলা হয়েছিল, যাতে একজন যুবলীগ কর্মী নিহত ও অন্তত ২৯ জন আহত হন। এই মামলায় সাবেক সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, সাবেক হবিগঞ্জ পৌর মেয়র জি কে গউছ ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে জবানবন্দি দেন এবং মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করেন। আদালত ২১ এপ্রিল যুক্তিতর্ক শুরুর দিন ধার্য করে। এই মামলাটি ২১ আগস্টের ঢাকার মামলা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক এবং এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
তথ্যসূত্র
মন্তব্য করুন