ঢাকা রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

‘অপারেশন জ্যাকপট’-এ মোংলা সমুদ্রবন্দর গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রলয়ংকরী ইতিহাস

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:০৫ পিএম
১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম
‘অপারেশন জ্যাকপট’-এ মোংলা সমুদ্রবন্দর গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রলয়ংকরী ইতিহাস

১৯৭১ সালের ১৫ আগস্টের ‘অপারেশন জ্যাকপট’ ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম দূরদর্শী ও দুঃসাহসিক নৌ-গেরিলা অভিযান। কলম্বো হয়ে বঙ্গোপসাগরের নৌপথে পাকিস্তানি বাহিনীর সৈন্য, সমরাস্ত্র ও রসদ সরবরাহ সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন ও অকার্যকর করার যৌথ পরিকল্পনা করে ভারত ও বাংলাদেশ সরকার। তৎকালীন নৌ-কমান্ডো সেক্টরের (সি-সেক্টর) অধীনে আগস্টের মধ্যভাগে একযোগে চট্টগ্রাম, মোংলা, নারায়ণগঞ্জ ও নদীবন্দরগুলোতে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে দ্বিতীয় প্রধান ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু ছিল মোংলা সমুদ্রবন্দর।

মোংলা অভিযানের প্রস্তুতি ও দীর্ঘ পথপরিক্রমা

কমান্ডো স্কোয়াড ও শপথগ্রহণ

ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা সাবমেরিনার মো. আহসানউল্লাহকে প্রধান (গ্রুপ লিডার) করে ৪৮ জন অকুতোভয় নৌ-কমান্ডোর একটি বিশেষ স্কোয়াড গঠন করা হয়। ১৯৭১ সালের মার্চের পূর্বে মোংলা ও সংলগ্ন এলাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সুনির্দিষ্ট ঘাঁটি না থাকলেও, যুদ্ধ শুরুর পর পাকিস্তান নৌবাহিনী সেখানে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং প্রচুর গানবোট মোতায়েন করে।

৫ আগস্ট: কমান্ডোদের কলকাতার ডায়মন্ড হারবারের ক্যানিং নদীবন্দরে নেওয়া হয়।

৬ আগস্ট: পলাশী ট্রেনিং ক্যাম্পের খ্যাতিমান প্রশিক্ষক লেফটেন্যান্ট কপিল কমান্ডোদের বিদায় জানান এবং দুপুরে দলটি ভারত সীমান্তের সর্বদক্ষিণে কৈখালী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পৌঁছায়।

৭ আগস্ট: কৈখালী থেকে বিদায় নিয়ে সুন্দরবন ও তৎসংলগ্ন নদীপথ ধরে মোংলা বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হয়।

১২ আগস্ট: খুলনার কয়রা থানার কালাবগি গ্রামে পৌঁছায় দলটি।

১৩ আগস্ট: মোংলার নিকটবর্তী সুতারখালী গ্রামে অস্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন করা হয়, যেখানে সকালে আকাশবাণী রেডিওর সংকেত পাওয়ার পর চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু হয়।

১৪ আগস্ট (রেকি ও শপথ): সকালে দুই নৌ-কমান্ডো ও এক স্থানীয় গাইড শত্রুর অবস্থান রেকি করেন। বিকেলে পর্যবেক্ষণ শেষে বন্দরে জাহাজের অবস্থান ও টাইডাল চার্ট উপস্থাপন করা হয় এবং দলনেতা আহসানউল্লাহ জঙ্গল ঘেঁষে মুষ্টিবদ্ধ হাতে সব কমান্ডোকে দেশের জন্য জীবন বাজির চূড়ান্ত শপথ করান।

১৫ আগস্টের ভয়াল যুদ্ধ: স্রোতের বিপরীতে জীবন বাজি

প্রস্তুতি ও বানিয়াশান্তার মোড়

১৪ আগস্ট সন্ধ্যার পর কমান্ডোরা যৎসামান্য আহার শেষ করে ফিনস, সুইমিং কস্টিউম, বুকে গামছা দিয়ে মাইন ও প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ এবং কোমরে ড্যাগার বেঁধে নেন। সেফটি ফিউজ জ্বালানোর জন্য পলিথিনে মোড়ানো দেশলাই সঙ্গে রাখা হয় এবং শরীরে মাখা হয় শর্ষের তেল। সুতারখালী থেকে ১২ কিলোমিটার দূরের মোংলা বন্দরে পৌঁছাতে সময় হিসাব করা হয়েছিল জোয়ার-ভাটার সন্ধিক্ষণ (রাত ২টা) ধরে, যেন স্রোতের টানে কেউ সাগরে ভেসে না যান।

তবে বিপরীত স্রোতের কারণে নৌকা চালিয়ে বন্দরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় ভোর হয়ে যায়। নদীর অপর তীরে বানিয়াশান্তা গ্রামে হঠাৎ সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে গেরিলা নেতা তাদের নিজ নিজ ঘরে আশ্রয়ে বাধ্য করেন।

অপারেশন জ্যাকপট: মোংলা বন্দর এক নজরে তথ্য বিবরণী
অভিযানের সময়কাল ১৫ আগস্ট ১৯৭১ (ভোর ৫:৩০ মি. থেকে ৬:৩০ মি.)
মূল নেতৃত্ব সাবমেরিনার মো. আহসানউল্লাহ
মোট কমান্ডো সংখ্যা ৪৮ জন (৬টি লক্ষ্যবস্তুর জন্য ৮ জন করে বিভক্ত)
কৌশল ও ছদ্মবেশ ফিনস, লিমপেট মাইন, মুখে কচুরিপানা ও ডুবসাঁতার
অভিযানের ক্ষয়ক্ষতি ৬টি সমুদ্রগামী জাহাজ সম্পূর্ণ তলিয়ে যায় এবং ১টি সোমালিয়ান জাহাজে বিপুল সমরাস্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়

আজানের ধ্বনি ও কচুরিপানার ছদ্মবেশ

বন্দরের মসজিদ থেকে যখন ফজরের আজান ভেসে আসছিল, তখন ৪৮ জন কমান্ডো ৬টি জাহাজে ৮ জন করে বিভক্ত হয়ে প্রচণ্ড স্রোতের পশুর নদে ঝাঁপ দেন। সার্চলাইটের আলোর চোখ ফাঁকি দিতে সবাই মুখের সামনে কচুরিপানা ধরে ডুবসাঁতারে এগোতে থাকেন।

বিস্ফোরণ ও পশুর নদে ধ্বংসযজ্ঞ

সকাল ছয়টার কাঁটা ছুঁতেই মাইনের প্রথম বিকট বিস্ফোরণ ঘটে। একে একে প্রলয়ংকরী শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো পশুর নদ।

পাকিস্তানি গানবোটগুলো হেভি মেশিনগান ও মর্টার থেকে নদীর পশ্চিম তীরে অন্ধের মতো গোলাবর্ষণ শুরু করে এবং আক্রান্ত বাণিজ্যিক জাহাজগুলো বিপৎসংকেত (SOS) পাঠাতে থাকে। এর মধ্যেই কমান্ডোরা সাঁতরে তীরে উঠে অপেক্ষমাণ নৌকায় চেপে সফলভাবে স্থান ত্যাগ করেন।

অভিযানের ফলাফল ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য

ক্ষতি ও অর্জিত সাফল্য

জাহাজ ডুবানো: এই অভিযানে শত্রুপক্ষের ৬টি বিশাল সমুদ্রগামী জাহাজ ও বার্জ সম্পূর্ণভাবে পানির নিচে তলিয়ে যায়।

‘এসএস লাইটনিং’ (SS Lightning) ধ্বংস: সোমালিয়ার পতাকা উড়িয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য আনা বৃহদাকার জাহাজ ‘এসএস লাইটনিং’ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই জাহাজে গমের নিচে প্রায় ২০,০০০ টন ভারী যুদ্ধাস্ত্র ও বিস্ফোরক লুকিয়ে আনা হয়েছিল, যা ব্যবহারের আগেই ধ্বংস করা সম্ভব হয়।

অপারেশন জ্যাকপটের মোংলা বন্দর আক্রমণ কেবল পাকিস্তান বাহিনীর রসদ ও অস্ত্রের শমন ঘটায়নি, বরং বিশ্ব পরিমণ্ডলে প্রমাণ করেছিল বাঙালি নৌ-কমান্ডোদের রণকৌশল ও অতুলনীয় আত্মত্যাগের ক্ষমতা। মোংলা সমুদ্রবন্দরের এই জয় মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়কে বহুদূর এগিয়ে দিয়েছিল।

তথ্যসূত্র

  • বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: সেক্টর ভিত্তিক ইতিহাস (১০ম খণ্ড)
  • অপারেশন জ্যাকপট: মোংলা বন্দর যুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী যোদ্ধা ও কমান্ডো বিবরণী
অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

১৫ আগস্ট ২০২৬: ইতিহাস, বর্তমান ও করণীয়

‘অপারেশন জ্যাকপট’-এ মোংলা সমুদ্রবন্দর গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রলয়ংকরী ইতিহাস

চট্টগ্রাম বন্দরের দুর্ধর্ষ নৌ কমান্ডো ডা. মোহাম্মদ শাহ আলম বীর উত্তম

চট্টগ্রাম বন্দরে ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এর নায়ক আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী বীর উত্তম, বীর বিক্রম

ইতিহাসের পাতায় এক বীরের পদচ্ছাপ / নৌ-কমান্ডো এনামুল হক ও অপারেশন জ্যাকপট

দুর্ধর্ষ সাঁতারু মুক্তিবাহিনীর অজানা বীরত্বগাথা

শেখ হাসিনার নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ও মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের বিষয়ে একমত যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত

ফ্রান্স থেকে বাংলাদেশ / প্রিয়ভূমি’র টানে ৮ নৌসেনার দুঃসাহসিক পলায়ন

ছিনতাইকারীদের ধাক্কা, সড়কে পড়ে কাভার্ড ভ্যান চাপায় শিক্ষার্থী নিহত

৫ বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার মার্কিন বিনিয়োগ আনার আশ্বাস অ্যামচেমের

১০

২৭ আগস্ট বসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন

১১

গ্যাস-কয়লা সংকটে বন্ধ ৪১ বিদ্যুৎকেন্দ্র / ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ে কাবু দেশ

১২

সিরিয়ায় ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপতি বাশার আল-আসাদের মৃত্যুদণ্ড

১৩

ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের দুই বছরের সীমা তুলে দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

১৪

রুশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ‘অপারেশন জ্যাকপট ডে’ স্মারক অনুষ্ঠান ১৬ আগস্ট

১৫

গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেলো সুনামগঞ্জের কাঙ্ক্ষিতা

১৬

‘র’ প্রধান পরাগ জৈন ঢাকায়

১৭

১৩ বছর পর রাজাকার আজাদের আত্মসমর্পণ ও আপিল, শুনানি ১৭ আগস্ট

১৮

এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ, পাশের হার ৬২.২৫ শতাংশ

১৯

ইলিয়াস আলী গুম মামলা: উইং কমান্ডার সাইফুরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

২০