ঢাকা রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

চট্টগ্রাম বন্দরের দুর্ধর্ষ নৌ কমান্ডো ডা. মোহাম্মদ শাহ আলম বীর উত্তম

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএম
ডা. মোহাম্মদ শাহ আলম বীর উত্তম | ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করার অদম্য আকুতিতে চিকিৎসাশাস্ত্রের বই-খাতা ছেড়ে যিনি তুলে নিয়েছিলেন লিমপেট মাইন ও ড্যাগার, তিনি নৌ কমান্ডো ডা. মোহাম্মদ শাহ আলম। মহান মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দরে পরিচালিত ঐতিহাসিক ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এর অন্যতম রূপকার ও নির্দেশক ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে (সনদ নম্বর: ৫৬)।

ডা. মোহাম্মদ শাহ আলমের জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৩ নভেম্বর নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার করমুল্লাপুর গ্রামে। ১৯৬৭ সালে কর্ণফুলী পেপারমিলস হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৬৯ সালে রাঙ্গুনিয়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন তিনি। এরপর ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন এমবিবিএস প্রথম বর্ষের অদম্য এক তরুণ ছাত্র।

পলাশীর ভাগীরথী ও আত্মঘাতী প্রশিক্ষণ

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গণহত্যার পর তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গমন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ২৩ মে মুক্তিবাহিনীর প্রধান কর্নেল এম এ জি ওসমানীর নির্দেশে ‘নৌ-কমান্ডো সেক্টর’ (সি-সেক্টর) গঠিত হলে বিভিন্ন সেক্টর থেকে তরুণদের মধ্য থেকে নৌ-কমান্ডো বাছাই শুরু হয়। শাহ আলমও কঠোর বাছাই প্রক্রিয়ায় টিকে যান।

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর নির্জন ক্যাম্পে টানা আড়াই মাস কঠোর ও প্রাণঘাতী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শুরুর আগেই তরুণদের স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছিল—এটি একটি আত্মঘাতী যুদ্ধ, যেখান থেকে জীবিত ফেরার গ্যারান্টি নেই।

চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ ও দুঃসাহসিক রেকি অপারেশন

অপারেশন জ্যাকপটের জন্য দলনেতা এ ডব্লিউ চৌধুরীর অধীনে ৬০ জনের যে মূল স্কোয়াড গঠিত হয়, শাহ আলম ছিলেন সেই দলের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ৮ আগস্ট হরিণায় আসার পর চট্টগ্রাম বন্দর আক্রমণের সুবিধার্থে পুরো দলকে ৩টি উপ-দলে ভাগ করা হয়। শাহ আলমকে একটি উপ-দলের কমান্ডার বা দলনেতার দায়িত্ব দেওয়া হয় (অপর দুই কমান্ডার ছিলেন মোজাহার উল্লাহ ও আবদুর রশিদ)।

  • কঠিন পথপরিক্রমা: সাব্রুম সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে মুহুরী ও ফেনী নদী পেরিয়ে মীরসরাইয়ের ইছাখালী ও সমিতির হাটে পৌঁছান তাঁরা।
  • ছদ্মবেশে শহরে প্রবেশ: চেকপোস্টের চোখ ফাঁকি দিতে ১৩ আগস্ট ডা. শাহ আলম সহযোদ্ধাদের নিয়ে শাকসবজি বিক্রেতার ছদ্মবেশে বাসের ছাদে চেপে চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করেন।
  • চট্টগ্রাম বন্দরে রেকি (Reconnaissance): চট্টগ্রাম বন্দর ট্রাস্টের চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. কামাল হোসেনের মাধ্যমে বন্দর সচিব মিসবাহউদ্দিন খানের সাথে যোগাযোগ করেন তিনি। তাঁর সরকারি বাসভবনে আশ্রয় নিয়ে ১৪ আগস্ট সকালে ১ থেকে ১২ নম্বর জেটি পর্যন্ত সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। শাহ আলম শত্রু পাকিস্তানি সেনার গতিবিধি, বয়ার অবস্থান, জাহাজের সংখ্যা ও কর্ণফুলী নদীর স্রোতের ‘টাইডাল চার্ট’ সংগ্রহ করেন এবং নিউমুরিং ও নেভাল বেস এলাকা রেকি করে আসেন।

অপারেশন জ্যাকপট: সেই রক্তঝরা ১৫ আগস্ট

১৪ আগস্ট আকাশবাণী রেডিওতে নির্ধারিত দ্বিতীয় সংকেত নিশ্চিত হওয়ার পর অস্ত্র ও মাইন গোপন সরঞ্জাম দিয়ে আনোয়ারা থানার চরলক্ষ্যার খামারবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

১৫ আগস্ট প্রথম প্রহরে (১৪ আগস্ট মধ্যরাতের পর) ৩৭ জন আত্মঘাতী কমান্ডো ৩ জন করে মোট ১২টি গ্রুপে ভাগ হয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে লিমপেট মাইন ও ড্যাগার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন কর্ণফুলী নদীতে। নদী তীরে পাহারায় থেকে এ ডব্লিউ চৌধুরী ও মোজাহার উল্লাহর সাথে শাহ আলম পুরো অপারেশনের বিদায় ও নিরাপত্তা তদারকি করেন।

অপারেশন জ্যাকপটে ডা. শাহ আলমের ভূমিকা বিবরণ
মূল পদবি ও খেতাব দলনেতা/কমান্ডার, বীর উত্তম (সনদ নম্বর: ৫৬)
অপারেশনের স্থান চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও কর্ণফুলী নদী এলাকা
মূল দায়িত্ব বন্দর রেকি, টাইডাল চার্ট সংগ্রহ ও নদী তীর রক্ষা সমন্বয়
অপারেশনাল সাফল্য এমভি আল আব্বাস, এমভি হরমুজসহ ১০টি জাহাজ ও গানবোট ধ্বংস

রাত ১টা ৩০ থেকে ২টার মধ্যে মাইনগুলো বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে থাকে। এমভি আল আব্বাস, এমভি হরমুজ, অস্ত্র ও রসদবাহী একাধিক বার্জ ও গানবোটের সলিল সমাধি ঘটে।

অভিঘাত ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

অপারেশন জ্যাকপটের খবর সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই ঘটনার পর পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং জেনারেল ওসমানীর কঠোর সতর্কবার্তার পর বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজগুলো সেপ্টেম্বরের পর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আসতে অস্বীকৃতি জানায়।

স্বাধীনোত্তর জীবন ও প্রয়াণ

স্বাধীনতার পর ডা. মোহাম্মদ শাহ আলম পুনরায় মেডিকেল পড়াশোনা সম্পন্ন করে ১৯৭৫ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন এবং সহকারী সার্জন পদে যোগ দেন। ১৯৮২ সালে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের রেজিস্ট্রার হিসেবে পদোন্নতি পান।

দেশের এই বীর নৌ কমান্ডো ও চিকিৎসক ১৯৮৫ সালের ৭ মে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তথ্যসূত্র

  • বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (১০ম খণ্ড)
  • বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: সেক্টর ভিত্তিক ইতিহাস (১০ম খণ্ড)
অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

১৫ আগস্ট ২০২৬: ইতিহাস, বর্তমান ও করণীয়

‘অপারেশন জ্যাকপট’-এ মোংলা সমুদ্রবন্দর গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রলয়ংকরী ইতিহাস

চট্টগ্রাম বন্দরের দুর্ধর্ষ নৌ কমান্ডো ডা. মোহাম্মদ শাহ আলম বীর উত্তম

চট্টগ্রাম বন্দরে ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এর নায়ক আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী বীর উত্তম, বীর বিক্রম

ইতিহাসের পাতায় এক বীরের পদচ্ছাপ / নৌ-কমান্ডো এনামুল হক ও অপারেশন জ্যাকপট

দুর্ধর্ষ সাঁতারু মুক্তিবাহিনীর অজানা বীরত্বগাথা

শেখ হাসিনার নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ও মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের বিষয়ে একমত যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত

ফ্রান্স থেকে বাংলাদেশ / প্রিয়ভূমি’র টানে ৮ নৌসেনার দুঃসাহসিক পলায়ন

ছিনতাইকারীদের ধাক্কা, সড়কে পড়ে কাভার্ড ভ্যান চাপায় শিক্ষার্থী নিহত

৫ বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার মার্কিন বিনিয়োগ আনার আশ্বাস অ্যামচেমের

১০

২৭ আগস্ট বসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন

১১

গ্যাস-কয়লা সংকটে বন্ধ ৪১ বিদ্যুৎকেন্দ্র / ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ে কাবু দেশ

১২

সিরিয়ায় ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপতি বাশার আল-আসাদের মৃত্যুদণ্ড

১৩

ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের দুই বছরের সীমা তুলে দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

১৪

রুশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ‘অপারেশন জ্যাকপট ডে’ স্মারক অনুষ্ঠান ১৬ আগস্ট

১৫

গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেলো সুনামগঞ্জের কাঙ্ক্ষিতা

১৬

‘র’ প্রধান পরাগ জৈন ঢাকায়

১৭

১৩ বছর পর রাজাকার আজাদের আত্মসমর্পণ ও আপিল, শুনানি ১৭ আগস্ট

১৮

এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ, পাশের হার ৬২.২৫ শতাংশ

১৯

ইলিয়াস আলী গুম মামলা: উইং কমান্ডার সাইফুরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

২০