
আজ ১৫ আগস্ট, ২০২৬। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম শাহাদাতবার্ষিকী। ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তানকে। কিন্তু ইতিহাসের এই শোকাবহ দিনটি এবার পালিত হচ্ছে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে—যেখানে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি নেই, সরকারি ছুটি নেই, এবং খুনিদের বিচার কার্যকর করা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১.১ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট: ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরবেলা, সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্য ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাসভবনে আক্রমণ চালায়। এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নিহত হন।
নিহত ব্যক্তিরা ছিলেন:
প্রমুখ মোট ১৬ জন
বেঁচে যান: বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা—শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা—যারা তখন প্রবাসে ছিলেন।
১.২ হত্যাকাণ্ডের পর: ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ ও সামরিক শাসন
বঙ্গবন্ধু হত্যার পরপরই ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেন, যা খুনিদের বিচারের হাত থেকে রক্ষা করে। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে এই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করেন। এই আইন বলবৎ থাকায় বঙ্গবন্ধুর খুনিরা দীর্ঘ ২১ বছর বিচারের আওতার বাইরে ছিল।
২. বিচার প্রক্রিয়া: দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস
২.১ বিচারের সূচনা (১৯৯৬)
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
২.২ রায় ও দণ্ড কার্যকর
২৮ জানুয়ারি ২০১০: পাঁচ আসামির ফাঁসি কার্যকর হয়:
১১ এপ্রিল ২০২০: ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়; তিনি প্রায় দুই যুগ ভারতে আত্মগোপন করেছিলেন
৩. পলাতক আসামি: বিচার কার্যকর করায় বাধা
৩.১ পলাতক পাঁচ আসামি
নিম্নলিখিত পাঁচ আসামি এখনও পলাতক রয়েছেন:
৩.২ ফিরিয়ে আনতে বাধা
আওয়ামী লীগ সরকার চেষ্টা করলেও এই পাঁচ আসামিকে ফিরিয়ে আনতে সফল হয়নি। প্রত্যর্পণে প্রধান বাধাগুলো:
প্রত্যর্পণ চুক্তির অভাব: যেসব দেশে খুনিরা আশ্রয় নিয়েছে, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের শক্তিশালী প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই
মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা: অনেক পশ্চিমা দেশ মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করে না, ফলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফেরত পাঠাতে অনিচ্ছুক
আইনি জটিলতা: আসামিরা আশ্রয়প্রাপ্ত দেশের আদালতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে
রাজনৈতিক আশ্রয়: তারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করছে
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, "রাজনৈতিক চিন্তা করলে সরকারের নীতি এক ধরনের হবে, আর আইনের শাসনের কথা চিন্তা করলে, বাংলাদেশে যাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব।" তবে তিনি আরও বলেন, "এই সরকার চেষ্টা করলেও তাদের ফেরত আনতে পারবে না, এটাই বাস্তবতা।"
৪. বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
৪.১ অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত (২০২৪)
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয়। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই সরকার ১৫ আগস্টের সরকারি ছুটি ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বাতিল করে। ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
৪.২ বিএনপি সরকারের সিদ্ধান্ত (২০২৬)
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠিত হয়। এই সরকার ১৫ আগস্টের ছুটি বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। ফলে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মতো ২০২৬ সালেও রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালিত হচ্ছে না।
৪.৩ নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অবস্থা
বর্তমানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। দলটি কার্যত ছিন্ন-ভিন্ন অবস্থায় রয়েছে। আজ শনিবার আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। তবে ভারতপ্রবাসী দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা আজ রাতে ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় যুক্ত হবেন বলে জানা গেছে।
৪.৪ টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধের অবস্থা
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন প্রধান ফটকে কঠোর পুলিশি পাহারা বসিয়েছে। এ অবস্থায় বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পিতা-মাতার সমাধি জরাজীর্ণ রূপ নিয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মসজিদ, লাইব্রেরি, গবেষণা কেন্দ্র, উন্মুক্ত মঞ্চ, ফুলের বাগান—সবকিছু ময়লা-আবর্জনায় ভরে উঠেছে।
৫. বিশ্লেষণ: বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব
৫.১ ইতিহাসের পুনর্লিখন?
বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে ১৫ আগস্ট পালনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বাতিল হওয়াকে অনেকে ইতিহাসের পুনর্লিখন হিসেবে দেখছেন। বিএনপি আগেও (২০০১-২০০৬) এই ছুটি বাতিল করেছিল। ২০০৮ সালের ২৭ জুলাই হাইকোর্ট বিএনপি সরকারের সেই সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার আবারও সেই পথে হাঁটছে।
৫.২ আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
আন্তর্জাতিক মহল এই পরিবর্তনের দিকে নজর রাখছে। ১৯৭৫ সালের ঘটনার পর বিশ্বনেতারা তীব্র শোক প্রকাশ করেছিলেন:
নোবেলজয়ী জার্মান নেতা উইলি ব্রান্ডট বলেছিলেন, “যে বাঙালি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।”
দ্য টাইমস অব লন্ডন লিখেছিল, “তাকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই।”
নীরদ সি চৌধুরী বাঙালিদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
৫.৩ খুনিদের বিচার: একটি অমীমাংসিত অধ্যায়
রাজনৈতিক পালাবদলের ফলে খুনিদের ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা আরও জটিল হয়েছে। যেহেতু বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে এবং শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন, তাই রাজনৈতিকভাবে খুনিদের ফিরিয়ে আনতে সরকার তৎপর হবে না বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
৬. করণীয়: কী করা উচিত?
৬.১ রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ
৬.২ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পদক্ষেপ
৬.৩ ব্যক্তিগত উদ্যোগ
প্রত্যেক নাগরিক নিজ নিজ অবস্থানে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনা ধারণ করে জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারেন—যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সঠিক ইতিহাস প্রচার, বঙ্গবন্ধুর লেখা ও ভাষণ পড়া, এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়া।
১৫ আগস্ট, ২০২৬—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম শাহাদাতবার্ষিকী—একটি জটিল ও দ্বিধাবিভক্ত সময়ে এসেছে। একদিকে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি ও সরকারি ছুটি বাতিল, অন্যদিকে খুনিদের বিচার অনিশ্চিত ও সমাধিসৌধ জরাজীর্ণ। কিন্তু ইতিহাস সত্য ও ন্যায়ের পক্ষেই থাকে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও অবদান কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনে মুছে ফেলার মতো বিষয় নয়।
জাতির পিতার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা তখনই হবে, যখন তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনে সবাই একযোগে কাজ করবে, এবং যখন ১৯৭৫ সালের সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ বিচার নিশ্চিত হবে। আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব—ইতিহাসকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পথ খুঁজে বের করা, কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না থাকলেও।
মন্তব্য করুন