ঢাকা শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

ত্রিমোহনী গণহত্যা ও বধ্যভূমি, নেত্রকোনা

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৬:১৫ পিএম
ত্রিমোহনী গণহত্যা ও বধ্যভূমি, নেত্রকোনা

ত্রিমোহনীতে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে ১৯৭১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। এদিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ২৫ জন নিরীহ বাঙালিকে একযোগে গুলি করে হত্যা করে। ভাগ্যক্রমে সেদিন প্রফুল্ল সরকার নামে একজন বেঁচে যান। ত্রিমোহনী ট্র্যাজেডির এই প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য থেকে আমরা জানতে পারি সেই করুণ ইতিহাস।

প্রফুল্ল সরকারের সাক্ষ্য

প্রফুল্ল সরকার তখন ২০ বছরের যুবক। ১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল নেত্রকোনা শহরের শিবগঞ্জ রোড থেকে একদল রাজাকার তাকে বিনা কারণে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। থানা থেকে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়, এবং ম্যাজিস্ট্রেট তাকে জেলহাজতে পাঠান। তার মতো আরও ২৬ জনকে একইভাবে জেলহাজতে পাঠানো হয়, কিন্তু কেউই জানতেন না তাদের অপরাধ কী। দীর্ঘদিন হাজতবাসের পর কয়েকজন জামিনে মুক্তি পেলেও বেশিরভাগই জামিন পাননি।

২২ সেপ্টেম্বর ওই ২৬ জনকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালত সকলকে নির্দোষ ঘোষণা করে বেকসুর খালাস দেন। কিন্তু আদালত থেকে মুক্তি পেলেও পাকিস্তানি সেনাদের হিংস্রতা থেকে তারা রক্ষা পাননি। কোর্ট হাজতে কিছুক্ষণ অবরুদ্ধ রাখার পর তাদের কাছের একটি রেস্ট হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একজন সেনা কর্মকর্তা তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াতে নির্দেশ দেন। দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দড়ি দিয়ে সকলকে বেঁধে ফেলা হয়। এরপর মিলিটারি ট্রাকে করে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ত্রিমোহনী ব্রিজে।

রাত ৮টার দিকে পাকসেনাদের রাইফেল গর্জে ওঠে। একের পর এক গুলিবর্ষণে নিমিষেই শহীদ হন ২৫ জন নিরীহ বাঙালি। তাদের নাম: সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহা রায়, কামিনী কুমার চক্রবর্তী, নিশিকান্ত সরকার, সুরেন্দ্র চন্দ্র দে, কমল চন্দ্র সাহা, সুনীল চন্দ্র সাহা, সতীশ চন্দ্র সরকার, দুর্গানাথ চক্রবর্তী, ব্রজেন্দ্র চন্দ্র সরকার, মতিলাল সাহা (১), মতিলাল সাহা (২), পীযূষ কান্তি সাহা, দীপক কুমার সাহা, দিলীপ কুমার পাল, সন্তোষ চন্দ্র পাল (১), সন্তোষ চন্দ্র পাল (২), রমেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী, অজিত কুমার সাহা, সতীশ চন্দ্র সাহা, বিনয়ভূষণ সরকার এবং দীনেশ চন্দ্র সরকার।

প্রফুল্ল সরকারের অলৌকিক রক্ষা

ভাগ্যক্রমে সেদিন প্রফুল্ল সরকার বেঁচে যান। পাকসেনারা যখন তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি চালায়, তখন তিনি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভান করে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। হত্যাযজ্ঞ শেষে পাকসেনারা প্রত্যেকের লাশের সঙ্গে প্রফুল্ল সরকারকেও মগড়া নদীতে ফেলে দেয়। কিছুক্ষণ পর পাকসেনারা চলে যায়। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সারা রাত নদীর পানিতে হাবুডুবু খেয়ে অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে যান প্রফুল্ল সরকার। সেই দুঃসহ স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বলেন, “২৫ জন শহীদের বুকের তাজা রক্তে সেদিন মগড়ার পানি লাল হয়ে ওঠে। এরপর স্রোতের তোড়ে লাশগুলো একসময় অদৃশ্য হয়ে যায়।”

স্থানীয় সহযোগীদের ভূমিকা

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় আলবদর ও রাজাকারদের সরাসরি সহযোগিতায় এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ত্রিমোহনী ব্রিজ মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি ভয়ঙ্কর বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল, যেখানে নিরীহ বাঙালিদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হতো।

সূত্র

মুক্তিযুদ্ধ কোষ (দ্বিতীয় খণ্ড) – মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সহিংসতার নতুন উচ্চতা / মব হত্যা দ্বিগুণ, অজ্ঞাত লাশ বেড়েছে, সংখ্যালঘু নির্যাতন তীব্র

জঙ্গি সংগঠনগুলোর ন্যারেটিভ ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুক্তির আহ্বান ও শ্বাশত মুজিব’

সবচেয়ে উঁচুতে দাঁড়িয়ে ‘বীর’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জয় বাংলা’

ফরিদপুর স্টেডিয়াম বধ্যভূমি

ইতিহাসের সাক্ষী ঝিনাইদহের ‘প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ ফলক’

স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য / রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ

পবিপ্রবির ‘মুক্ত বাংলা’: উপকূলীয় জনপদে স্বাধীনতার অবিনাশী প্রতীক

কারাগারের গেটে স্ত্রী-সন্তানের লাশ: একটি রাষ্ট্রের নৈতিক পতনের চিত্র

১০

ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি নারী ও তাদের বিলাতযাত্রা

১১

নির্বাচনের মাঠে ধর্মের কার্ড: গণতন্ত্রের জন্য হুমকি?

১২

নারী ভোটারদের এনআইডি কপি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ আশঙ্কাজনক: মাহদী আমিন

১৩

সরকারের কাছে পাওনা ৪ হাজার কোটি টাকা / অর্থাভাবে বন্ধ হতে পারে বাঁশখালী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র

১৪

নয়া প্ল্যাটফর্ম নয়, পুরানো ভণ্ডামির নতুন দোকান

১৫

ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার নারীর বিয়ের উদ্যোগ বন্ধ হোক

১৬

জামায়াতে ইসলামী অনুতপ্ত নয় একাত্তরের জন্য ক্ষমা চায়নি

১৭

নিজে নিজে না নিভলে নেভে না যে আগুন

১৮

বৈষম্যের অভিশাপ / নতুন প্রজন্ম কি কেবলই একটি ‘বন্দি’ প্রজন্ম?

১৯

ঋণের বোঝায় বাড়ছে আত্মহত্যা: অর্থনৈতিক সংকটের ছায়ায় এক চলমান মানবিক বিপর্যয়

২০