

বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের মহাকাব্যে বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রতিটি সদস্যের ত্যাগের ইতিহাস মিশে আছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় পুত্র হিসেবে শেখ জামালের পরিচয় কেবল রক্তের বন্ধনে সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁর প্রতিটি কর্মে ফুটে উঠেছিল বঙ্গবন্ধুর অদম্য সাহস ও গভীর দেশপ্রেম। ১৯৫৪ সালের ২৮ এপ্রিল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণকারী এই বীর সন্তান পৈতৃক সূত্রে পাওয়া আদর্শের পথ ধরেই নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন এক অনন্য মানুষ হিসেবে।
ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ঐতিহাসিক বাড়িতে বড় হওয়ার সুবাদে শেখ জামাল খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন পিতার ত্যাগ ও জনগণের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন ও কারাবরণ থেকে তিনি শিখেছিলেন কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মাথা নত না করে অবিচল থাকতে হয়। পিতার সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন পরোপকারী, বিনয়ী এবং মানবিক।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে শেখ জামালকেও ধানমণ্ডির বাড়িতে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর রক্ত যাঁর ধমনিতে বহমান, তাঁকে কি আর শিকল দিয়ে আটকে রাখা যায়? ১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট অত্যন্ত দুঃসাহসিকতার সাথে বন্দিশালা থেকে পালিয়ে তিনি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে যান। সেখানে বিশেষ প্রশিক্ষণ শেষে ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। পিতার স্বপ্নের 'স্বাধীন বাংলাদেশ' অর্জনে রণাঙ্গনে নিজের জীবন বাজি রেখে তিনি বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন।
স্বাধীনতার পর শেখ জামাল চাইলে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেবার পথ বেছে নিয়েছিলেন। পিতার সুশৃঙ্খল দেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণে তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন। তিনি লন্ডনের বিশ্ববিখ্যাত 'রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্ট' থেকে সাফল্যের সঙ্গে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। তিনিই ছিলেন প্রথম বাঙালি, যিনি এই মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান থেকে কমিশন লাভ করার গৌরব অর্জন করেন। দেশে ফিরে তিনি ঢাকা সেনানিবাসের দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে লেফটেন্যান্ট হিসেবে যোগ দেন। বঙ্গবন্ধুর মতোই তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের অত্যন্ত কাছের মানুষ, যা তাঁর সহকর্মী ও সাধারণ সৈনিকদের প্রতি তাঁর আচরণে ফুটে উঠত।
বঙ্গবন্ধুর যেমন শিল্প-সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ছিল, শেখ জামালও ছিলেন তেমনি সংস্কৃতিমনা। তিনি সেতার ও গিটার বাজাতে পারতেন। পাশাপাশি খেলাধুলায় তাঁর ছিল বিশেষ উৎসাহ। ঢাকার জনপ্রিয় ক্রীড়া সংগঠন 'আবাহনী ক্রীড়াচক্র' গড়ে তোলার পেছনে তাঁর শ্রম ও অনুপ্রেরণা ক্লাবটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য পুত্র হিসেবে শেখ জামাল প্রমাণ করেছিলেন যে, দেশপ্রেম কেবল স্লোগানে নয়, বরং তা কাজে এবং আত্মত্যাগে নিহিত। তাঁর সংক্ষিপ্ত কিন্তু মহিমান্বিত জীবন আমাদের শেখায় কীভাবে আদর্শের প্রতি অবিচল থাকতে হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালো রাতে ঘাতকদের বুলেটে সপরিবারে প্রাণ হারান এই দীপ্তিময় তরুণ। মাত্র ২১ বছর বয়সেই তাঁর পথচলা থমকে গেলেও, পিতার অসম্পূর্ণ কাজগুলো এগিয়ে নেওয়ার যে তেজ তাঁর মধ্যে ছিল, তা আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে।
আজকের দিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি সেই বীরকে, যিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে নিয়ে এদেশের মাটি ও মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। শেখ জামালের জীবনদর্শন প্রতিটি তরুণ হৃদয়ে এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হয়ে বেঁচে থাকবে।
শুভ জন্মদিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল। আপনার রক্ত ও আদর্শ এদেশের মাটিকে করেছে আরও শক্তিশালী। আপনার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক: এস এম কামরুজ্জামান সাগর, নির্মাতা, সংগঠক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট
মন্তব্য করুন